শেষ বিকেলের খেলাঘর
শৈশবে হারিয়ে যাওয়া সময় বন্ধুত্ব আমাদের সকলের স্মৃতিকে তাড়না করে বেড়ায়। মনে পরেকি সেদিনের কথা
গাড়ির চাকা দুটো কাঁচা মাটির রাস্তায় জমা জল-কাদার উপর একটা গভীর ছপছপ শব্দ তুলে থেমে গেল। ড্রাইভার ছোকরা পেছন ফিরে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “দাদা, এর ভেতরে আর গাড়ি যাবে না। রাস্তা বড় কাঁচা, সামনে তো বাঁশের সাঁকোও আছে একটা।”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা খুললাম। পায়ের নিচে ভেজা মাটির পরশ পেতেই এক অদ্ভুত হিমেল অনুভূতি মাথা চাঙ্গা করে উঠল। শেষবার যখন এই পথ দিয়ে শহর পানে রওনা হয়েছিলাম, তখন আমার গায়ে ছিল সুতির পাতলা জামা, আর চোখের কোলে ছিল নতুন শহরের মোহে ভরা একরাশ রঙিন স্বপ্ন। আজ পঁচিশ বছর পর যখন সেই একই জায়গায় আবার পা রাখলাম, তখন আমার মাথার চুলে পাক ধরেছে, চোখের কোণে ফুটে উঠেছে জীবনের অজস্র হিসাব-নিকাশের বলিলেখা।
গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দটা নিঝুম গোধূলির বাতাসে বেশ দূর পর্যন্ত ভেসে গেল। চারপাশটা কেমন যেন গমগম করছে। বাতাস বইছে, সেই বাতাসে আছে ভিজে মাটির এক চেনা সোঁদা গন্ধ, কলাপাতার ভেজা ঘ্রাণ, আর বিলের জলজ গাঢ় সুবাস। হাতের সুटकेসটা শক্ত করে ধরে মেঠো পথ ধরে হাঁটা শুরু করলাম। চারপাশের প্রকৃতি যেন আমায় দেখেও চিনতে পারছে না, আবার চেনার ভানও করছে। ধূসর বিকেলে সূর্যটা ঠিক পশ্চিমে, বাঁশবাগানের মাথার উপর হেলে পড়েছে। কনেদেখা আলো ফুটে উঠেছে পলি জমে থাকা ধানখেতের উপরিভাগে।
একটু এগোতেই পথের পাশে একটা ছোট পুকুর। পুকুরের ঘাটটা এখন আর আগের মতো বাঁধানো নেই, ইটগুলো খসে পড়েছে, সেওলায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। কিন্তু এই ঘাটটার দিকে তাকাতেই আমার বুকের ভেতরটা যেন হুট করে একতাল কাদামাটির মতো দুমড়ে গেল। এই তো সেই ঘাট! বৈশাখের খাঁ-খাঁ দুপুরে রতন, মিলন, বাবু আর জাহিদকে নিয়ে কত শতবার আমরা এই জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছি।
রতনের গায়ের রঙ ছিল কুচকুচে কালো, কিন্তু হাসলে তার দাঁতগুলো যেন রাতের আকাশে তারার মতো চমকে উঠত। তার বাবা ছিল গ্রামের একমাত্র দর্জি। মিলন আবার একটু লাজুক স্বভাবের, পড়াশোনায় বেজায় ভালো কিন্তু কাঁচা আম কিংবা পেয়ারা চুরির বেলায় সবার আগে। আর বাবু? বাবু ছিল দলের সেরা ডানপিটে। তার মতো গাছের মগডালে চড়তে আর কেউ পারত না। জাহিদ ছিল আমাদের দলের সবথেকে ছোট, অথচ তার মেজাজ ছিল রাজা-বাদশাহদের মতো।
মনে পড়ে যাচ্ছে সেই সব দুপুরের কথা। গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোতে যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যেত, বড়দের চোখ এড়িয়ে আমরা সটান চলে আসতাম এই পুকুরপাড়ে। মা হয়তো ঘরে ঘুমিয়ে থাকতেন, আর আমি পা টিপে টিপে দরজার শেকল খুলে বেরিয়ে পড়তাম। পুকুরপাড়ে জমা হতো পুরো বাহিনী। রতন এসে বলত, “আজকে যে আগে জলে ঝাঁপ দেবে না, সে কিন্তু ছাগলের বাচ্চা!”
ব্যস, আর দেখে কে! জামাকাপড় কাদার ওপর ছুঁড়ে ফেলে এক এক করে আমরা সব ঝপাং করে লাফিয়ে পড়তাম ঠান্ডা জলে। কে কতক্ষণ জলের নিচে দম বন্ধ করে থাকতে পারে, তা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। জাহিদ প্রায়ই ফাঁকি দিত, জলের নিচে গিয়ে খানিক দূর ভেসে উঠে মুখ বার করে হাঁফাত, আর মিলন তা ধরে ফেলে হা-হা করে হেসে উঠত।
পুকুরপাড় ছেড়ে আরও খানিকটা মেঠো পথ পেরিয়ে এগোতেই দেখলাম সেই পুরোনো শ্যাওলা ধরা মেহগনি গাছের সাড়ি। বাতাসটা কেমন যেন হু-হু করে এসে গায়ে লাগছে। এখন গাঁয়ের রাস্তায় আর আগের মতো মানুষের চলাচল নেই। দু-একটা সাইকেলের টুংটাং শব্দ কিংবা দূর থেকে ভেসে আসা রাখালের তাড়িয়ে নেওয়া গরুর গলার ঘণ্টার টুং-টাং ছাড়া চারদিক কেমন থমথমে।
একটু হাঁটতেই চোখে পড়ল আমাদের সেই পুরোনো মোড়টা। যেখানে বিকেল হলেই গ্রামের প্রবীণরা আড্ডা জমাতেন, আর আমরা ছুটে চলতাম বটতলার খোলা মাঠটার দিকে। কিন্তু মোড়ে পৌঁছাতেই আমার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল।
কোথায় সেই বটবৃক্ষ?
যে বিশাল বটগাছটা বছরের পর বছর ধরে ডালপালা ছড়িয়ে পুরো গ্রামটাকে একটা পরম মমতায় ছায়া দিয়ে রাখত, যার ঝুরি ধরে আমরা দোল খেতাম, কানামাছি খেলার সময় যার গুঁড়ির পেছনে লুকিয়ে থাকত বাবু কিংবা রতন—সেই বটগাছটি আর নেই। সেখানে কেটে রাখা একটা মস্ত বড় মোথা পড়ে রয়েছে, আর তার চারপাশে গজিয়ে উঠেছে কয়েকটা অযত্নের আগাছা। বটগাছটার এই শূন্যতা যেন আমার বুকের পাজরটাকে সজোরে একটা ধাক্কা দিল। গাছটা কেবল একটা উদ্ভিদ ছিল না, ওটা ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক।
বটতলার সাথেই লাগোয়া ছিল আমাদের সেই খেলার মাঠ। বিশাল, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ। সেই মাঠের দিকে তাকাতেই আমার বুকটা হাহাকার করে উঠল। মাঠটার বেশিরভাগ অংশেই এখন উঠে গেছে ইট-সিমেন্টের তৈরি চারকোণা সব দালানকোঠা। কারো বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঢুকে গেছে মাঠের পেটের ভেতর, কোথাও আবার ফেলে রাখা হয়েছে আধভাঙা ইট আর বালুর স্তূপ। যে মাঠে আমরা মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে দাপিয়ে বেড়াতাম, সেই মাঠটা আজ সংকুচিত হতে হতে যেন একটা মৃতপ্রায় প্রಾಣীর মতো নিঃশ্বাস ফেলছে।
আমি পথের ধারে সুटकेসটা রেখে সেই মাঠের বেঁচে থাকা বিষণ্ণ ঘাসগুলোর ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখ দুটো বুজে আসতেই কত পুরোনো দিনের কোলাহল মাথার ভেতরে তরঙ্গ তুলে ভেসে উঠল।
বর্ষাকালের কথা খুব মনে পড়ে। আষাঢ়ের ভারী মেঘ যখন আকাশজুড়ে ঘন হয়ে নামত, আর ঝুমঝুম করে নামত বৃষ্টি, তখন আমাদের ঘরে আটকে রাখা কার সাধ্য ছিল! মা শত বারণ করলেও আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছুটতাম এই মাঠে। মাঠ তখন কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে। কিন্তু সেই কাদামাটিই যেন আমাদের জন্য হয়ে উঠত স্বর্গ।
প্লাস্টিকের একটা আধফোলা লিক হওয়া ফুটবল নিয়ে চলত আমাদের বিশ্বযুদ্ধ। কাদার ভেতর পা পিছলে আছাড় খাওয়া, গা-হাত-পা কাদায় মেখে ভূত হয়ে যাওয়া, আর গোলের জন্য তুমুল চিৎকার—সে এক অপূর্ব মাতলামি! রতন যখন কাদার ওপর স্লাইড করে বলটা ছিনিয়ে নিত, আর জাহিদ কাদার চোটে চোখ মেলতে না পেরে চ্যাঁচাত—সেই দিনগুলোর কথা ভেবে আজও আমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। ফুটবল খেলা শেষে আমরা সবাই পুকুরে গিয়ে কাদা ধুয়ে বাড়ি ফিরতাম। বাড়ি ফেরামাত্রই মায়ের কড়া ধমক আর কুলপির মতো গরম খিচুড়ি—সব মিলিয়ে কী এক অপূর্ব তৃপ্তি জড়িয়ে থাকত প্রতিটি সাঁঝবেলায়।
আর শীতকালের বিকেলগুলো? সে তো অন্য এক গল্প। তখন মাঠজুড়ে চলত গোল্লাছুট আর দাঁড়িয়াবান্ধার লড়াই।
মাঠের মাঝখানে দাগ কেটে আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে যেতাম। একদলে বাবু আর জাহিদ, অন্যদলে আমি আর রতন। মিলন থাকত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে, যদিও সে সব সময় সুযোগ পেলেই আমাদের পক্ষে একটু পক্ষপাতিত্ব করত। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার সময় রতনের সেই সতর্ক চোখ দুটো আমি কখনো ভুলব না। দাগের ওপর দাঁড়িয়ে সে যেভাবে হাত দুটি ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে আটকানোর চেষ্টা করত, তা দেখে মনে হতো যেন কোনো মহাবীর দুর্গ রক্ষা করছে।
“ওরে রতন, ডানে দেখ! জাহিদ কিন্তু ঘুরে গেল!”—আমি চেঁচিয়ে উঠতাম।
রতন ত্বরিত গতিতে ঘুরে গিয়ে জাহিদের জামা ছুঁয়ে ফেলত আর চেঁচিয়ে উঠত, “আউট! আউট!”
জাহিদ তখন মুখ হাঁড়ি করে বলত, “না, আমি দাগ ছুঁয়ে ফেলেছি! রতন ফাঁকি দিয়েছে!”
তাই নিয়ে চলত দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক, হাতাহাতি, আর শেষে জাহিদের সেই অভিমান করে একপাশে বসে থাকা। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার আগেই আবার সব অভিমান ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেত। খেলা শেষে আমরা সবাই মাঠের এক কোণে বসে পড়ে পকেট থেকে বের করতাম মার্বেল বা গুলি। কাঁচের সেই রঙিন গোলকগুলোর ভেতর যেন আটকে থাকত আমাদের গোটা জগতের সমস্ত জাদু। আঙুলের টোকায় যখন একটা মার্বেল গিয়ে অন্যটাকে ঠক করে আঘাত করত, তখন মনে হতো যেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জয়টা হাতছানি দিয়ে গেল।
শরতের দিনগুলোতে নীল আকাশে যখন তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াত, তখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসত ঘুড়ির লাটাই। সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার জন্য কী কসরতই না করতাম আমরা! কাঁচের গুঁড়ো আর আঠা মেখে সুতো শুকোতে দেওয়া হতো উঠোনে। রতন দূর থেকে ঘুড়ি উড্ডয়ন করত, আর আমি লাটাই হাতে টান দিতাম। আকাশে যখন আমাদের ‘পেটকাটি’ কিংবা ‘চাঁদতারা’ ঘুড়িটা ডানা মেলত, তখন মনে হতো আমরা নিজেরাই বুঝি ওই নীল দূরন্ত আকাশে উভে যাচ্ছি।
আর হঠাৎ যদি অন্য পাড়ার কারো সাথে ভো-কাট্টা হয়ে যেত, তবে সেই কাটা ঘুড়ি ধরার জন্য ডোবা-নালা, বাঁশবাগান পেরিয়ে আমাদের সেই পাগলাটে দৌড়! কাটা ঘুড়িটা যার হাতে উঠত, সে যেন কোনো জাদুদণ্ড খুঁজে পেত।
আজ এই নিঝুম সাঁঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সেই ঘুড়িটার সাথেই যেন কেটে গেছে আমাদের নিজেদের জীবনের সুতো। আমরাও তো কাটা ঘুড়ির মতোই ছিটকে পড়েছি একেক জন একেক দিকে।
আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম হলো। পশ্চিমের আকাশে সোনালি আলোটা রক্তিম রূপ নিতে শুরু করেছে। বাঁশবাগানের পেছন থেকে সাঁঝের বাতাস বয়ে আসছে, তার সাথে মিশে আছে মেঠো ধুলোর ঘ্রাণ। দূরে কোথাও আযানের সুর ভেসে আসছে গভীর ও মিষ্টি এক করুণতায়।
আমি মাঠের একপাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। যেখানে একসময় একটা পুরোনো আমগাছ ছিল, যার তলায় আমরা কানামাছি আর লুকোচুরি খেলতাম। চোখ বন্ধ করলে আমি আজও শুনতে পাই জাহিদের গলা— “এক, দুই, তিন… দশ! আমি কিন্তু চোখ খুললাম! যে যেখানে লুকিয়েছিস সামলা!”
বাবু হয়তো আমগাছের পাতার আড়ালে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকত, আর মিলন লুকিয়ে থাকত মাঠের ধারের ডোবার পেছনের ঝোপে। জাহিদ যখন কাউকে খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে চ্যাঁচাত, তখন আমরা আড়াল থেকে খিলখিল করে হেসে উঠতাম। সেই হাসির শব্দে কেঁপে উঠত বিকেলের শান্ত বাতাস।
কোথায় গেল সেই হাসিগুলো? কোথায় হারিয়ে গেল সেই ছোট্ট মানুষগুলো?
সময় এক অদ্ভুত জাদুকর। সে বড় নির্মমভাবে মানুষকে বড় করে তোলে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের একমাত্র অধীর অপেক্ষা ছিল—কখন বড় হব। বড় হওয়া মানেই তো স্বাধীনতা, বড় হওয়া মানেই তো নিজের মতো করে বাঁচা। কিন্তু বড় হয়ে যখন বুঝলাম, বড় হওয়া মানে আসলে শৈশবের সেই নিষ্কলঙ্ক আনন্দগুলোকে একে একে বিসর্জন দেওয়া, বড় হওয়া মানে কাঁচের মার্বেলের বদলে কাগজের টাকার পেছনে ছুটে চলা, বড় হওয়া মানে বন্ধুত্বের সরল সহজ হাতগুলোর বদলে কঠিন হিসাব-নিকাশের পৃথিবীতে একা হয়ে যাওয়া—তখন আর ফিরে আসার কোনো পথ খোলা থাকে না।
রতন এখন কোথায় আছে, আমি জানি না। শুনেছিলাম সে বহু বছর আগে ভাগ্যের অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক দূর দেশে পাড়ি জমিয়েছিল। সেখানে তীব্র রোদে কায়িক পরিশ্রম করে সে হয়তো তার পরিবারের চাকা ঘোরাচ্ছে, কিন্তু তার সেই মুক্তোর মতো উজ্জ্বল হাসিটা কি আজও অক্ষত আছে? নাকি ওখানকার উত্তপ্ত বালি আর মরুভূমির বাতাস তার সেই হাসিটাকে শুষে নিয়েছে?
মিলন শহরের এক বড় করপোরেট অফিসে চাকরি করে। গত বছর একবার ব্যস্ত শহরের এক ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ির কাঁচের ওপার থেকে তাকে দেখেছিলাম। গায়ের দামি স্যুট, চোখে ক্লান্তির গাঢ় ছাপ, আর হাতে দামি ফোন। আমি গাড়ি থেকে নেমে ডাকার আগেই সিগন্যাল সবুজ হয়ে গিয়েছিল, আর মিলনের গাড়িটা শহরের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল। যে মিলন একসময় সামান্য এক টাকার চাটনি ভাগ করে খাওয়ার জন্য আমার পেছনে দৌড়াত, সে আজ কত কোটি টাকার ভিড়ে একা, তা কে জানে!
আর বাবু? বাবু তো আর এই পৃথিবীতেই নেই।
পাঁচ বছর আগে এক বর্ষার রাতে হঠাৎ করে আসা এক মারণব্যাধি তাকে কেড়ে নিয়েছিল। যে বাবু গাছের মগডাল থেকে লাফিয়ে পুকুরের জলে পড়তে ভয় পেত না, সেই শক্তিমান ছেলেটা নাকি বিছানায় ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল। খবরটা পাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, আমাদের শৈশবের একটা বড় অংশ যেন বাবুর সাথেই মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল।
আর জাহিদ… জাহিদ গ্রামের ভিটেমাটি বিক্রি করে পরিবার নিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে। কেউ বলে সে এখন উত্তরের কোনো এক শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করে, কেউ বলে সে আর এ দেশে নেই।
আমরা যারা একসময় একটা আমগাছের ছায়ায় একসাথে রক্তসূর্য দেখতাম, যারা একে অপরের টিফিনের ভাগ না পেলে না খেয়ে থাকতাম, তারা আজ পৃথিবীর পাঁচটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছি। সময়ের এই নির্মম টানে আমাদের সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে, রয়ে গেছে কেবল বুকের ভেতর জমে থাকা কিছু অবলীলার স্মৃতি।
হঠাৎ করেই চারপাশটা কেমন যেন বেশি নিশব্দ হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো তাদের চিরাচরিত গম্ভীর সুরে ডাকতে শুরু করেছে। চারপাশের বাঁশবাগান আর নারকেল গাছের সারির ওপর নেমে আসছে সন্ধ্যার গাঢ় ছায়া। দূরের বাড়িগুলো থেকে ডালের ঘ্রাণ আর সলতে জ্বালানো প্রদীপের মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে।
আমি সেই মাঠের মাঝে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বিকেলের শেষ আলোটুকু যখন দিগন্তের কোল ঘেঁষে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন আমার কেমন যেন এক ঘোরের মতো লাগল।
হঠাৎ করে মনে হলো, খুব কাছ থেকে, ঠিক কয়েক গজ দূর থেকে বাচ্চাদের সম্মিলিত খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসছে!
আমি চমকে উঠলাম।
স্পষ্ট শুনতে পেলাম— “ওরে মিলন, পালা! রতন কিন্তু তোকে ধরে ফেলল বলে!”
সেই চেনা গলা! সেই উত্তেজনায় ভরা চিৎকার, সেই পা ফেলার ছপছপ শব্দ, সেই বাতাসের দোলায় ভেসে আসা উচ্ছ্বাস!
আমার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে লাফিয়ে উঠল। স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আমি এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে তাকালাম।
কিন্তু… সেখানে কেউ নেই।
কেবল শ্যাওলা ধরা কয়েকটা বাঁশের ঝোপ, নিঃসঙ্গ পড়ে থাকা আধভাঙা ইটের স্তূপ, আর সন্ধ্যার ম্লান বাতাসে দোলে থাকা বিষণ্ণ ঘাসের দল।
কোনো শিশু সেখানে খেলছে না। কোনো কানামাছি নেই, কোনো গোল্লাছুটের দাগ নেই। মাঠের বুকজুড়ে কেবল এক গম্ভীর, অসীম নীরবতা ডানা মেলে বসে আছে।
আমি কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাতাসটা এসে আমার মুখের ওপর হালকা দোলা দিয়ে গেল। আমার হাত দুটো আপনা থেকেই নিজের বুকের ওপর গিয়ে ঠেকল।
তখন আমি বুঝতে পারলাম—দূরে ভেসে আসা সেই হাসির শব্দটা অন্য কারোর ছিল না। সেটা ছিল কোনো বাস্তব শিশুর কোলাহল নয়, ওটা ছিল এই ভিজে মাটিতে জমা হয়ে থাকা আমারই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের প্রতিধ্বনি।
যে শৈশবকে আমি বহু বছর আগে এই মাঠের ধুলোয় ফেলে রেখে শহরে চলে গিয়েছিলাম, সে আজ এত বছর পর আমায় পেয়ে নিঃশব্দে ডেকে উঠল। কিন্তু তাকে আর স্পর্শ করার কোনো উপায় আমার নেই। তাকে আর ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো অধিকার সময় আমায় দেবে না।
সূর্যটা ততক্ষণে পুরোপুরি ডুবে গেছে। দিগন্তে কেবল রয়ে গেছে এক চিলতে কালচে লাল আভা। আমি ধীর পায়ে সুटकेসটার দিকে এগোলাম। হাত দিয়ে সেটা তুলে নিলাম।
পিছন ফিরে আর তাকালাম না। কারণ আমি জানি, ফিরে তাকালে আমি আর এই গ্রাম ছেড়ে যেতে পারব না। এই ছায়াছন্ন মেঠো পথ, এই নীরব পুকুরঘাট, আর এই স্মৃতিময় মাঠ আমাকে তাদের একলা থাকার বেদনায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলবে।
অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে নামল গ্রামের বুকে। মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই এমন একটা শেষ বিকেলের খেলাঘর থাকে—যেখান থেকে একসময় সব খেলার সঙ্গীরা একে একে বিদায় নেয়, আর পড়ে থাকে কেবল আলো-আঁধারির এক দীর্ঘশ্বাস।
আজকের এই ধুলোমাখা অন্ধকার মেঠো পথে দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, মানুষ আসলে কখনো বড় হয় না; সে শুধু তার অমূল্য শৈশবটাকে কোনো এক শেষ বিকেলের বিষণ্ণ মাঠে চিরকালের জন্য
ফেলে রেখে একলা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অভিনয় করে যায়।
