নোটিশ
ছোটগল্প

হাসির ছোট গল্প সংকলন | ৫টি সেরা বাংলা মজার গল্প

পড়ুন ৫টি সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিখাদ বিনোদনে ভরা বাংলা হাসির ছোট গল্প। দৈনন্দিন জীবনের মজার ঘটনা ও চমৎকার পরিস্থিতির এই ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি গল্প সংকলনটি আপনার মন ভালো করে দেবে।

m.lekhokbd.meলেখক 1 মিনিটে পড়া যাবে 14 বার পঠিত 1 মন্তব্য
অক্ষরের মাপ
hasir choto golpo
1

হাসির ছোট গল্প

গল্প ১: বিশেষজ্ঞদের বিশেষজ্ঞ

মতিউর সাহেবের ধারণা, দুনিয়ার যেকোনো বিষয়ের আসল রহস্য একমাত্র তিনিই বোঝেন। ডাক্তাররা ভুল চিকিৎসা করে, মেকানিকরা অহেতুক টাকা মারে, আর ইঞ্জিনিয়াররা কেবল খাতা-কলমে হিসাব মেলাতে পারে। বাস্তব জীবনের সব গিট খোলার আসল চাবিকাঠি নাকি মতিউর সাহেবের এই সাড়ে তিন ছটাক মগজের ভেতর গিজগিজ করছে।

একদিন সকালে মতিউর সাহেবের ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা থমকে গেল। চারকোনা কাঠের ফ্রেমের বেশ পুরোনো দোলক ঘড়ি। টিকটিক শব্দ বন্ধ হতেই স্ত্রী রেহেনা বেগম বললেন, “বাজারের মোড়ের করিম মিয়ার দোকানে দিয়ে আসো তো। চার শ টাকার মতো নেবে, ঘড়িটা আবার সচল হয়ে যাবে।”

মতিউর সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে হাসলেন। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সেই হাসি। তিনি চায়ের কাপে একটা শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “করিম মিয়া? ওই ব্যাটা কী বোঝে ঘড়ির? মেকানিকদের কাজই হলো ঘড়ির একটা সামান্য নাট লুজ করে রেখে চার শ টাকা পকেটে ভরা। আমি থাকতে করিম মিয়ার কাছে টাকা ঢালবে? আনো তো স্ক্রু ড্রাইভারটা।”

রেহেনা বেগম চিন্তিত গলায় বললেন, “তুমি আবার ওটায় হাত দিয়ো না গো। গতমাসে ওয়াশিং মেশিন ঠিক করতে গিয়ে ওটার মোটর থেকে ধোঁয়া বের করে ছেড়েছিলে।”

“ওটা ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং ফল্ট, কোম্পানির লোক এসে বলে গেছে না?” মতিউর সাহেব ঘড়িটা দেয়াল থেকে নামিয়ে এনে ডাইনিং টেবিলে বসালেন।

পেছনের ঢাকনা খুলতেই ভেতরে গাদা গাদা পেতলের চাকা, স্প্রিং আর ছোট ছোট নাট-বল্টু দেখা গেল। মতিউর সাহেব একগাল হেসে চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বললেন, “দেখলে? বিজ্ঞানের কত সহজ খেলা! করিম মিয়া এই চাকা দুটো একটু ঘষে দিয়ে চার শ টাকা হাঁকাত। মূল সমস্যা হলো এর স্প্রিংয়ের টেনশনে। ফিজিক্সের সহজ হিসাব।”

তিনি সাবধানে একটা ছোট চিমটা দিয়ে প্রধান গিয়ারের পাশের একটা স্প্রিং টেনে টিপে দিলেন। একটা বিকট ‘টং’ শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোট্ট চকচকে স্ক্রু খসে পড়ে ডাইনিং টেবিল গড়িয়ে নিচে কার্পেটে হারিয়ে গেল।

মতিউর সাহেব এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ভাবলেশহীন মুখে বললেন, “ওটা ছিল অতিরিক্ত নাট। আধুনিক প্রযুক্তিতে ম্যানুফ্যাকচারাররা ওজন বাড়ানোর জন্য কিছু ফালতু পার্টস দিয়ে রাখে। না হলেও চলে।”

ঠিক তখনই ঘড়িটার ভেতর থেকে ঘড়ঘড় শব্দ হতে লাগল। সাধারণ অবস্থায় ঘড়িতে ঘণ্টা বাজে একবার, দুবার কিংবা দুপুর বারোটায় বারোবার। কিন্তু মতিউর সাহেবের বিজ্ঞানসম্মত স্পর্শ পেয়ে ঘড়ির ভেতরের হাতুড়িটা উন্মাদের মতো পিটাতে শুরু করল—‘ঢং, ঢং, ঢং, ঢং…!’

পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল, ঘড়ির ঢং ঢং বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। যেন ঘড়িটি প্রতিজ্ঞা করেছে জীবনের সব ঘণ্টা একসঙ্গে বাজিয়ে তারপর দম ছাড়বে।

রেহেনা বেগম রুমাল দিয়ে চোখ পুছতে পুছতে এসে বললেন, “ওগো, এটা কী করলে? বাড়ি শুদ্ধ লোক তো ভেবে বসবে গ্রামে কেউ মারা গেছে আর তার জন্য বিপদসংকেত বাজছে!”

মতিউর সাহেব ঠাণ্ডা মাথায় দাঁড়িয়ে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই। এটা সাউন্ড ভাইব্রেশন টেস্ট। যান্ত্রিক গোলযোগ মিটে গেলেই বন্ধ হবে।”

শব্দ থামানোর জন্য মতিউর সাহেব চিমটা দিয়ে আরেকটা গিয়ারে চাপ দিতেই ঘড়ির কাঁটা দুটো উল্টো ঘুরে মিনিটে তিন চক্কর দিতে শুরু করল। পেছনের ঢাকনা থেকে একটা সরু স্প্রিং সাপের মতো গিজগিজ করে বের হয়ে সোজা মতিউর সাহেবের চশমার কাচে এসে ‘ঠাস’ করে আঘাত করল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। তাদের বাড়িওয়ালা আলতাফ সাহেব এসেছেন তিন মাসের বকেয়া ভাড়ার তাগাদা দিতে। আলতাফ সাহেব বেশ কড়া মেজাজের লোক। কিন্তু দরজা খুলেই তিনি থমকে গেলেন।

কক্ষে বিকট ‘ঢং ঢং’ শব্দ হচ্ছে, ডাইনিং টেবিলে মতিউর সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন—তার হাতে স্ক্রু ড্রাইভার, নাকের ওপর বাঁকা হয়ে ঝুলে থাকা চশমা, আর মুখভর্তি পেতলের কালি। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, ঘড়ির ভেতর থেকে একটা বড় পেতলের দোলক উছলে উঠে ঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে লাফ মারল।

ফ্যানটা চলছিল মাঝারি গতিতে। দোলকটি ফ্যানের ডানায় লেগে ‘ঠাস’ করে বাড়ি খেয়ে সোজা আলতাফ সাহেবের টাক মাথার ঠিক মাঝখানে গিয়ে পড়ল।

আলতাফ সাহেব বিকট হুংকার দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। “মতিউর সাহেব! এসব কী হচ্ছে? আপনি কি আমাকে হত্যা করার জন্য ঘরে ফাঁদ পেতে রেখেছেন?”

মতিউর সাহেব হাত উঁচিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “আলতাফ সাহেব, একদম ভয় পাবেন না! এটা গ্র্যাভিটি এবং সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের একটা আকস্মিক বিক্রিয়া। ফ্যানের গতিবেগ আর দোলকের ভরের ভেক্টর হিসাব করলে দেখা যাবে আঘাতের তীব্রতা মোটেও প্রাণঘাতী নয়।”

আলতাফ সাহেব চোখ লাল করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আপনার ফিজিক্স মারান! আমার মাথায় ইটের মতো বাড়ি মারলেন আবার লেকচার দিচ্ছেন? এখন ভাড়ার টাকা দিন, নয়তো আজই ঘর খালি করুন!”

মতিউর সাহেব আলতাফ সাহেবকে শান্ত করতে এবার পেছনের ড্রয়ার থেকে নিজের বানানো বিশেষ ইলেকট্রনিক টেস্টার বের করলেন। বললেন, “আপনার মাথায় একটু বরফ দিচ্ছি, আর দাঁড়ান—আমি ঘড়ির মেইন সুইচটা ডিসকানেক্ট করে দিচ্ছি।”

তিনি কোনো কিছু না ভেবেই দেয়ালের সকেটের সঙ্গে থাকা ঘড়ির ঝুলন্ত তারটা এক টানে টেনে ছিঁড়ে ফেললেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ওটা ঘড়ির তার ছিল না; ওটা ছিল পাশের মেইন সুইচে থাকা পুরো ঘরের বিদ্যুৎ লাইনের মূল নিউট্রাল তার!

এক মুহূর্তের জন্য বিকট শব্দে একটা নীল স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ড্রয়িংরুম অন্ধকার! একই সঙ্গে ওপরের সিলিং ফ্যানটা কাঁপতে কাঁপতে খুলে এসে সোজা আলতাফ সাহেবের কোলের ওপর ঝুপ করে পড়ে গেল।

ভাগ্য ভালো যে ফ্যানের ঘুরন্ত ডানাগুলো ততক্ষণে বিদ্যুৎ হারিয়ে ধীর হয়ে এসেছিল, তাই বড় দুর্ঘটনা ঘটল না। তবে অন্ধকার ঘরের মধ্যে আলতাফ সাহেব কোলের ওপর ফ্যান নিয়ে এবং মাথায় দোলকের চোট খেয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলেন।

অন্ধকারের মধ্যেই মতিউর সাহেবের গলায় সেই চেনা আত্মবিশ্বাসের সুর ভেসে এলো, “রেহেনা, দেশলাইটা কোথায়? চিন্তার কিছু নেই আলতাফ সাহেব, আমি বুঝতে পেরেছি গোলমালটা কোথায় হয়েছিল। বাড়ির ফিউজ তারের রেজিস্ট্যান্স একটু কম ছিল। আমি কালকেই একটা তামার তার দিয়ে কানেকশনটা শক্ত করে দিচ্ছি, আর ঘড়িটার একটা ছোট গিয়ার করিম মিয়াকে দিয়ে…”

অন্ধকারের মধ্যেই আলতাফ সাহেবের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শব্দ হলো। তিনি কোনো কথা না বলে, অন্ধকারেই দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, “আমি কালকে বাড়ি বিক্রি করে দেব। এই বাড়িতে কোনো বিশেষজ্ঞ থাকে, যে ফিজিক্স দিয়ে মানুষ খুন করার চেষ্টা করে!”

পরদিন সকালে বাজারের মোড়ে করিম মিয়ার ঘড়ির দোকানে একটা দৃশ্য দেখা গেল।

করিম মিয়া টেবিলে রাখা ঘড়ির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া পার্টসগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রেহেনা বেগম।

করিম মিয়া জিজ্ঞেস করল, “ভাবি, ঘড়ির এই দশা কীভাবে হলো? মনে হচ্ছে এর ওপর দিয়ে কোনো মাঝারি সাইজের রোলার চলে গেছে!”

রেহেনা বেগম নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “রোলার না করিম, ঘরের বিশেষজ্ঞের হাত পড়েছিল।”

এমন সময় দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে মতিউর সাহেবকে দেখা গেল। মুখে হালকা হাসি, হাতে একটা নতুন শ্যাফট আর ড্রিল মেশিন। করিম মিয়াকে দেখে মতিউর সাহেব বেশ বিজ্ঞের মতো গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “করিম, ঘড়ির মেইন আইডিয়াটা ঠিকই ছিল, বুঝেছ? সমস্যা হয়েছিল যন্ত্রাংশের মেটাল কোয়ালিটিতে। জার্মানি থেকে আমাদানি করা পেতল হলে কালই কাজটা হয়ে যেত। তবে চিন্তার কিছু নেই, আমি কাল তোমার দোকানের আইসি সার্কিটটা একটু চেক করে দিয়ে যাবনে, ওটায় প্রচুর কারেন্ট লস হচ্ছে!”

কথাটা শুনেই করিম মিয়া আঁতকে উঠে চটপট দোকানের সাটার আধখানা নামিয়ে দিল।

গল্প ২: বাঁশঝাড়ের গোয়েন্দা

শীতকালের সকাল। হরিপুর গ্রামে হালকা কুয়াশা জমে আছে। গ্রামের মাঝপথের বটতলায় বসে চা খাচ্ছিলেন নজরালী। নজরালী সাহেবের মূল পেশা কৃষি হলেও আসল নেশা হলো গোয়েন্দাগিরি। গ্রামে কোনো মুরগি ডিম দেওয়া বন্ধ করলে কিংবা কারো ঘরের চাল থেকে লাউ চুরি গেলে নজরালী চোখ ছোট ছোট করে বলেন, “রহস্য গভীর! এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক চক্র বা রাতের আঁধারের কালো হাত কাজ করছে।”

আজ সকালে নজরালী চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বটতলা থেকে উঠতেই দেখলেন, জব্বার মাতবরের ছোট ছেলে কদম দৌড়ে আসছে। কদমের মুখ শুকনো, চোখে ভয়।

“নজরালী কাকা! সর্বনাশ হয়ে গেছে! বাঁশঝাড়ের পেছনে… অমাবস্যার রাতে কি কিছু হয়েছিল?” কদম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

নজরালী সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখের তারা জ্বলজ্বল করে উঠল। “কী দেখেছিস কদম? খুলে বল! নজরালীর চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়।”

কদম ভয়ে ভয়ে বলল, “আমদের পুব ভিটার বাঁশঝাড়ের পেছনের কাদা মাটিতে বিশাল বড় এক জোড়া পায়ের ছাপ! সাধারণ মানুষের পা অত বড় হতে পারে না কাকা! যেন কোনো একপায়ে দানব লাফিয়ে লাফিয়ে গেছে। সাথে একটা লাল রঙের ভেজা কাপড়ের টুকরো বাঁশের ডালে ঝুলে আছে!”

নজরালী চাদরটা গ গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে মোচে একটা তাড়া দিলেন। “হুম! কাদা মাটি, প্রকাণ্ড পায়ের ছাপ, লাল কাপড়! কেসটা বেশ জটিল মনে হচ্ছে। গ্রামে কোনো অপশক্তি বা ডাকাত দল ডেরা বেঁধেছে। চল, অকুস্থল পরিদর্শন করতে হবে।”

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে খবরটা পুরো গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। নজরালীর পেছনে পেছনে ততক্ষণে অর্ধেকের বেশি গ্রামবাসী রওনা হয়েছে বাঁশঝাড়ের দিকে। মাতবর সাহেব নিজে হাতে লাঠি নিয়ে আগে আগে হাঁটছেন।

বাঁশঝাড়ের কাছে পৌঁছে নজরালী সবাইকে হাত উঁচিয়ে থামতে বললেন। “কেউ এগোবে না! পিনপতন নীরবতা বজায় রাখো। আলামত নষ্ট হলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে।”

নজরালী পকেট থেকে একটা ভাঙা হাতশিস (ম্যাগনিফাইং গ্লাস) বের করলেন। হাঁটু গেড়ে বসে কাদামাটির ছাপটা পরীক্ষা করতে লাগলেন।

ছাপটা সত্যিই অদ্ভুত। সাধারণ মানুষের পায়ের চেয়ে দ্বিগুণ চওড়া। পায়ের বুড়ো আঙুলের জায়গায় মনে হচ্ছে একটা প্রকাণ্ড গোলাকার খাদের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি ছাপের দূরত্ব প্রায় চার হাত! অর্থাৎ, যার পা, সে সাধারণ হাঁটা হাঁটেনি—লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে।

মাতবর সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “নজরালী, এটা কি কোনো জিনের কাজ? নাকি মেহেরপুরের সেই ‘একঠেঙে পেতনি’ আমাদের গ্রামে চলে এলো?”

নজরালী বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললেন, “জিনের পায়ে কখনো এমন কাদার ছাপ পড়ে না মাতবর সাহেব। ভালো করে দেখুন, পায়ের ছাপে একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন আছে। এটা কোনো সাধারণ পেতনি নয়। আমার ধারণা, শহরের কোনো দুর্ধর্ষ ফেরারি আসামি লাল কাপড়ের ছদ্মবেশে আমাদের গ্রামে এসে লুকিয়ে আছে। সে হয়তো বিশেষ ধরনের জুতো পরে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে যাতে তার আসল পরিচয় গোপন থাকে!”

গ্রামের বুড়ো মনসুর মিয়া কেঁপে উঠে বলল, “বলেন কী নজরালী ভাই! ফেরারি আসামি? তাহলে তো রাতে পাহারা বসাতে হবে!”

নজরালী হাত তুলে থামালেন, “পাহারা পরে। আগে লাল আলামতটা পরীক্ষা করতে হবে।”

তিনি বাঁশের ডাল থেকে লাল কাপড়ের ভেজা টুকরোটা সাবধানে একটা কাঠি দিয়ে নামিয়ে আনলেন। কাপড় থেকে একটা তীব্র, বিদঘুটে গন্ধ বের হচ্ছে।

নজরালী শুঁকেই চোখ বড় বড় করলেন, “রাসায়নিক বিস্ফোরক! অথবা কোনো মারাত্মক বিষাক্ত ওষুধের গন্ধ! আসামিরা রাতে বিষাক্ত কোনো দ্রব্য তৈরি করছিল এই বাঁশঝাড়ে বসে।”

উপস্থিত জনতা ভয়ে চার হাত পিছিয়ে গেল। কদম তো প্রায় কেঁদেই ফেলল।

নজরালী এবার গ্রামে জরুরি বৈঠক ডাকলেন। মাতবরের বাড়ির উঠোনে বসলো পঞ্চায়েত। নজরালী চক দিয়ে উঠোনের মাটিতে একটা নকশা আঁকলেন।

“দেখুন,” নজরালী লাঠি দিয়ে নকশায় টিপ দিতে দিতে বললেন, “আসামির হাঁটার গতিপথ বলছে, সে বাঁশঝাড় থেকে বের হয়ে পশ্চিমের পুকুরপাড় দিয়ে গোরস্থানের দিকে গেছে। তার পায়ের ছাপের দূরত্ব চার হাত। তার মানে তার উচ্চতা অন্তত সাত ফুট! আর সে লাল কাপড়ের ভেতর বিপজ্জনক কোনো তরল বহন করছিল।”

মাতবর সাহেব বললেন, “এখন আমাদের করণীয় কী নজরালী? পুলিশে খবর দেব?”

“না!” নজরালী হাঁকালেন। “পুলিশ আসার আগেই যদি আমরা আসামিকে ধরে ফেলতে পারি, তবে পুরো মহকুমায় হরিপুর গ্রামের নাম ডাক ছড়িয়ে পড়বে। আজ রাতে আমরা গোরস্থান ঘেরাও করব। সবাই হাতে বাঁশের লাঠি, টর্চ আর লঙ্কার গুঁড়ো নিয়ে তৈরি থাকবেন।”

রাত দশটা। কুয়াশায় চারিদিক অন্ধকার। নজরালীর নেতৃত্বে প্রায় বিশজন গ্রামবাসী গোরস্থানের ঝোপঝাড়ের পেছনে লুকিয়ে আছে। সবার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক আর উত্তেজনা। নজরালী হাত নেড়ে সংকেত দিচ্ছেন।

ঠিক এমন সময় গোরস্থানের পাশ থেকে একটা অদ্ভুত খসখস শব্দ শোনা গেল। তারপরই দেখা গেল, কুয়াশার ভেতর দিয়ে চার হাত লাফিয়ে লাফিয়ে বিশাল এক আকৃতির কালো অবয়ব এগিয়ে আসছে! তার মাথায় আবার লাল রঙের কী যেন একটা পেঁচানো!

নজরালী ফিসফিস করে বললেন, “ঐ যে! সেই সাত ফুটের বিপজ্জনক আসামি! সবাই তৈরি হও… আমি তিন গুনলেই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে!”

অবয়বটি আরও কাছে এলো। কুয়াশার আলোর মধ্যে দেখা গেল, লোকটি বাঁ পা টা অদ্ভুতভাবে টেনে টেনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে।

নজরালী চেঁচিয়ে উঠলেন, “আক্রমণ! লঙ্কার গুঁড়ো মারো!”

দশ-বারোজন গ্রামবাসী চিৎকার করে লাঠি উঁচিয়ে ঝোপঝাড় থেকে লাফিয়ে পড়ল। “ধরে ফেল! আসামি পালাচ্ছে!”

কিন্তু আসামি পালানোর কোনো চেষ্টাই করল না। উল্টো অত্যন্ত পরিচিত এক গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “ওরে বাবা গো! মেরে ফেলল রে! তোরা কারা রে ভাই? ও মাতবর ভাই, রক্ষা করো!”

টর্চের আলো একযোগে গিয়ে পড়ল লোকটির মুখের ওপর।

সবাই থমকে গেল। নজরালীর হাতের লাঠি খসে পড়ে গেল।

লোকটি আর কেউ নয়, পাশের গ্রামের ‘কালা মজনু’! মজনু পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি।

মজনু মাটিতে বসে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে বলল, “তোরা মাঝরাতে গোরস্থানে ওত পেতে আমাকে মারতে এলি কেন রে ভাই? আমি কী অপরাধ করেছি?”

নজরালী চোখ গোল গোল করে এগিয়ে গেলেন। “মজনু? তুই? তোর পায়ের এই প্রকাণ্ড ছাঁচ কেন? তুই লাফিয়ে হাঁটছিস কেন?”

মজনু তার ডান পা টা তুলে দেখাল। সেখানে একটা বিশাল কাঠের তৈরি গোল খাট বা চৌপায়ার পায়া বাঁধা! আর তার বাম পা ভাঙা, তাই শক্ত করে প্লাস্টার করা।

মজনু বলল, “আর বলিস না নজরালী ভাই! পরশু দিন কাজ করতে গিয়ে পা-টা মচকে গেল। ডাক্তার বলল সাতদিন পা মাটিতে ফেলা যাবে না। কিন্তু আমার তো হাঁটা লাগে! তাই ঘরে একটা পুরোনো গোল কাঠের পায়া ছিল, ওটা দড়ি দিয়ে ভালো করে বাম পায়ে বেঁধে নিয়েছি, যাতে ওটার ওপর ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে পারি! কাঠের পায়ার তলাটা গোল আর চওড়া তো, তাই কাদায় বসে যায়।”

গ্রামের সবাই হতবাক। নজরালী গলার টোন বদলে বললেন, “ত-তা বেশ… কিন্তু ওই লাল কাপড়টা কী? ওটায় তো বিষাক্ত কেমিক্যালের গন্ধ!”

মজনু কেঁদে ফেলে বলল, “ওটা আমার গামছা রে ভাই! কাল রাতে পানের দোকানে জর্দা কিনে গামছায় মেখে রেখেছিলাম। বাঁশঝাড় দিয়ে আসার সময় ডালে আটকে ছিঁড়ে যায়। আর জর্দানের তীব্র গন্ধ পাচ্ছিস না তোরা?”

পুরো গোরস্থানে এক মুহূর্তের নীরবতা।

মাতবর সাহেব ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নজরালীর দিকে তাকালেন। নজরালী তখন খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা পকেটে ঢোকানোর ভান করছেন আর আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে বলছেন, “আজকে কালপুরুষ নক্ষত্রটা বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, তাই না মাতবর সাহেব?”

মাতবর সাহেব গর্জে উঠলেন, “নজরালী! তুই সাত ফুটের কাল্পনিক আসামি ধরার জন্য পুরো গ্রামকে লঙ্কার গুঁড়ো আর লাঠি নিয়ে মাঠে নামালি?”

নজরালী কাশি দিয়ে বললেন, “আরে মাতবর সাহেব, জিনিসটাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন কেন? ভাবুন তো, যদি সত্যিই কোনো আসামি আসত, আমাদের গ্রামের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কত মজবুত থাকত! এটা আসলে একটা ‘মহড়া’ ছিল। সিকিউরিটি ড্রিল!”

কিন্তু গ্রামবাসী ততক্ষণে লাঠি তুলে নজরালীর দিকে এগোতে শুরু করেছে।

নজরালী আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে, মজনুর চেয়েও লম্বা লাফ দিয়ে কুয়াশার মধ্যে দৌড় দিলেন। সেই রাতে গ্রামের মানুষ নতুন একটা কথা শিখল—হরিপুরের সবচেয়ে বড় রহস্য আসলে কোনো একঠেঙে দানব নয়, নজরালীর মাথায় থাকা অতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরির ভূত!

গল্প ৩: নিখুঁত পরিকল্পনার খেসারত

কামরুল সাহেব বিশ্বাস করেন, যেকোনো কাজ যদি প্রপার প্ল্যানিং বা নিখুঁত নকশা ছাড়া করা হয়, তবে সেই কাজ পণ্ড হতে বাধ্য। তিনি তার জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড ঘড়ির কাঁটা ধরে হিসাব করেন। তার ডাইনিং টেবিলের পাশে একটা বড় হোয়াইটবোর্ড টানানো আছে, যেখানে দিনের প্রতি ঘণ্টার কাজের তালিকা সুন্দর করে মার্কার দিয়ে লেখা থাকে।

আজ রবিবার। কামরুল সাহেবের বিবাহবার্ষিকী।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই কামরুল সাহেব স্ত্রী নীলাকে বললেন, “নীলা, আজকে আমাদের দশম বিবাহবার্ষিকী। প্রতি বছর আমরা সাধারণভা বে পালন করি। কিন্তু আজ আমি টাইম ম্যানেজমেন্টের এক অনন্য নজির গড়ব। আজ বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টার মধ্যে আমরা যা যা করব, তার একটা নির্ভুল শিডিউল তৈরি করেছি।”

নীলা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “কামরুল, প্লিজ! গতবার কিন্তু তোমার শিডিউলের চক্করে পেস্ট্রি শপের লোক বার্গারের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এবার কিচ্ছু করার দরকার নেই, আমরা ঘরেই ডাল-ভাত খাই।”

“অসম্ভব!” কামরুল সাহেব পকেট থেকে চার্ট বের করলেন। “শোনো, বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিট: ড্রাইভার রাজ্জাক গাড়ি নিয়ে হাজির হবে। ৫টা ১৫ মিনিট: আমরা নিউমার্কেটের শাড়ি দোকানে ঢুকব। ৫টা ৪৫ মিনিট: শাড়ি কেনা শেষ। ৬টা ১৫ মিনিট: রেস্তোরাঁয় পৌঁছানো। ৬টা ৩০ মিনিট: স্পেশাল বিফ ক্যাসারোল অর্ডার। ৭টা ৪৫ মিনিট: ডিনার শেষ। ৮টা ১৫ মিনিট: রিকশা করে লেকের পাড়ে আবহাওয়া উপভোগ। ৮টা ৪৫ মিনিট: ঘরে ফেরা। পুরো প্রসেসে কোনো বিচ্যুতি ঘটবে না!”

নীলা আর কথা বাড়ালেন না। কারণ তিনি জানেন, কামরুল সাহেবকে বোঝাতে যাওয়া আর দেওয়ালে মাথা কোটা একই কথা।

বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে কামরুল সাহেব ঘড়ি দেখে তৈরি হয়ে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু রাজ্জাকের দেখা নেই। ৪টা ৪৮ বেজে যেতেই কামরুল সাহেবের কপালে ঘাম দেখা দিল। তিন মিনিট লেট! প্ল্যান এ ব্যর্থ হতে চলেছে!

তিনি রাজ্জাককে ফোন করলেন। রাজ্জাক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, গাড়ির পেছনের চাকা লিক হয়ে গেছে। চাকা বদলাতে দশ মিনিট লাগবে।”

“দশ মিনিট?” কামরুল সাহেব প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। “আমার পুরো প্রসেসের ফ্লোচার্ট নষ্ট হয়ে যাবে! না, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব না। প্ল্যান বি অ্যাক্টিভেট করছি!”

কামরুল সাহেব নীলার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে রাস্তায় নেমে এলেন। রাস্তায় তখন কোনো ট্যাক্সি নেই। কামরুল সাহেব দেরি সামাল দিতে এক রিকশাওয়ালাকে ডেকে বললেন, “ভাই, নিউমার্কেট যাবে? পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাতে পারলে ডাবল ভাড়া দেব!”

রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে বলল, “ছোড ভাই, এই ট্রাফিকের মধ্যে তো চিল পাখিরও পাঁচ মিনিট লাগব! তবে চেষ্টা মারতে পারি।”

রিকশাওয়ালা ডাবল ভাড়ার লোভে এমনভাবে রিকশা চালানো শুরু করল যে কামরুল সাহেব আর নীলা সিট আঁকড়ে ধরে প্রাথনা করতে লাগলেন। রিকশাটা গলি দিয়ে কাট মারতে গিয়ে সোজা এক মোড়ের সবজির ভ্যানের ওপর উঠে গেল।

এক ঝুড়ি টমেটো আর বেগুন এসে কামরুল সাহেবের সাদা ধবধবে পাঞ্জাবিতে আছড়ে পড়ল। নীলার শাড়িতেও লাল টমেটোর রস লেগে একাকার।

নীলা চোখ লাল করে বললেন, “কামরুল! এটা তোমার কোন প্ল্যান?”

কামরুল সাহেব পাঞ্জাবি থেকে টমেটোর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে ঘড়ি দেখলেন। “৫টা ১০! যাই হোক, আমরা নিউমার্কেটের কাছাকাছি এসে গেছি। সময় বেঁচেছে আট মিনিট! এটা একটা ছোটখাটো কোল্যাটারাল ড্যামেজ। সমস্যা নেই, আমরা কাপড়ের দোকানে গিয়ে নতুন পাঞ্জাবি কিনে নেব। ওটা আমাদের নিউমার্কেটের শিডিউলের সঙ্গেই অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে!”

যেমন চিন্তা, তেমন কাজ। দোকানে গিয়ে কামরুল সাহেব তড়িঘড়ি করে একটা নীল রঙের পাঞ্জাবি আর নীলার জন্য একটা লাল শাড়ি কিনে নিলেন। জামা পরিবর্তন করে তারা যখন বের হলেন, তখন ঘড়িতে ৬টা ১৫ মিনিট!

“একদম পারফেক্ট টাইম!” কামরুল সাহেব উচ্ছ্বসিত। “এবার রেস্তোরাঁয় ডিনার!”

তারা শহরের নামজাদা রেস্তোরাঁ ‘রাজমহল’-এ গিয়ে পৌঁছালেন। কিন্তু রেস্তোরাঁর দরজায় বিশাল লাইন। ওয়েটার জানাল, টেবিল খালি হতে অন্তত আধা ঘণ্টা লাগবে।

কামরুল সাহেব সাহেবের মেজাজ বিগড়ে গেল। “আধা ঘণ্টা? অসম্ভব! আমার শিডিউলে লেখা ৬টা ৩০ মিনিটে বিফ ক্যাসারোল টেবিলে থাকবে। আমি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলব!”

ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কামরুল সাহেব নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “দেখুন, আমি টাইম অপটিমাইজেশন বিশেষজ্ঞ। আমার কাছে ৩০ মিনিট নষ্ট করার মতো সময় নেই। আপনি আমাকে একটা ফাঁকা টেবিল দিন, আমি আপনাকে ডাবল টিপস দেব এবং আপনার রেস্তোরাঁর সার্ভিস স্পিড বাড়াতে একটা ফ্লোচার্ট বানিয়ে দেব!”

ম্যানেজার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল, “স্যার, আপনি যদি ভিআইপি রুমের মাঝখানের ওই ছয়জনের টেবিলে একা বসতে চান, তবে এখনই দেওয়া যাবে। তবে ওখানে আরও দুজন কাস্টমার বসবেন।”

“কোনো সমস্যা নেই! শেয়ারিং বেসিসেই চলবে!” কামরুল সাহেব নীলাকে নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসলেন।

ঠিক ৬টা ৩০ মিনিটে বেয়ারা এসে গরম গরম ক্যাসারোল পরিবেশন করল। কামরুল সাহেব তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “দেখলে নীলা? পারফেক্ট টাইমিং! প্ল্যানিং থাকলে বাধা বলে কিছু থাকে না।”

ঠিক তখনই তাদের টেবিলে এসে বসলেন দুজন ভদ্রলোক। তাদের দেখে কামরুল সাহেবের গলার মাংস আটকে যাওয়ার জোগাড় হলো।

আগত ব্যক্তিদের একজন হলেন কামরুল সাহেবের অফিসের বস—ইশতাক সাহেব! আর অন্যজন অফিসের প্রধান হিসাবরক্ষক।

ইশতাক সাহেব চোখ বড় বড় করে বললেন, “অ্যাঁ, কামরুল সাহেব না? আপনি এখানে? আর আপনার পাঞ্জাবিতে ওটা কিসের দাগ? হলুদের দাগ?”

কামরুল সাহেব দ্রুত টমেটোর দাগ লুকানোর চেষ্টা করে তোতলাতে লাগলেন, “আ-আসলে স্যার… প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করতে গিয়ে টমেটোর সাথে একটা ছোট সংঘর্ষ হয়েছিল…”

বস বেশ অবাক হয়ে বললেন, “ শোনো কামরুল, ভালোই হলো তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কালকের অডিট রিপোর্টের কাজটা নাকি তুমি সময়মতো শেষ করতে পারোনি? অথচ এখানে বসে ম্যাজিকের মতো সময় মেলাচ্ছ?”

নীলা মুখ টিপে হাসছেন। কামরুল সাহেবের মুখ চুন হয়ে গেছে। তিনি বিফ ক্যাসারোল মুখে দিতে গিয়ে হাড়ে কামড় বসিয়ে ফেললেন। তা সত্ত্বেও বসের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর জন্য বললেন, “নো প্রবলেম স্যার! অডিট রিপোর্ট কাল সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে আপনার টেবিলে থাকবে। আমার লাইফে কোনো ডিলে নেই!”

ডিনার শেষ করে রেস্তোরাঁ থেকে বের হতে হতে বাজল ৭টা ৪৫ মিনিট।

“এখন লেকের পাড়ে আবহাওয়া উপভোগের সময়,” কামরুল সাহেব ঘাম মুছতে মুছতে বললেন।

নীলা বললেন, “কামরুল, আকাশ কিন্তু কালো হয়ে আসছে। মেঘের ডাক শুনছ? বৃষ্টি নামবে। চল বাড়ি ফিরে যাই।”

“অসম্ভব!” কামরুল সাহেব একগুঁয়ে গলায় বললেন। “আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী আজ রাত নয়টার আগে বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। আমি পাঁচ দিন আগের একিউওয়েদার রিপোর্ট চেক করেছি। এখন ৮টা ১৫ মিনিট, মানে এখন লেকসাইডের শান্ত পরিবেশ উপভোগের শিডিউল।”

তারা লেকের পাড়ে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসতেই পারলেন না—আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে এলো! সঙ্গে কালবৈশাখীর বিদঘুটে ঝড়ো হাওয়া।

মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তারা দুজন ধুয়েমুছে একাকার হয়ে গেলেন। ছাতা আনার কোনো কথা কামরুল সাহেবের শিডিউল বোর্ডে লেখা ছিল না!

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, কাদা মেখে, কামরুল সাহেব আর নীলা যখন রাত সাড়ে নয়টায় ঘরে ফিরলেন, তখন তাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল তারা কোনো ডুবো জাহাজের বেঁচে যাওয়া যাত্রী।

কামরুল সাহেব কাঁপতে কাঁপতে ডাইনিং টেবিলের পাশে গেলেন। হোয়াইটবোর্ডের দিকে তাকালেন। মার্কারের জলছাপ লেগে সব শিডিউল মুছে একাকার হয়ে গেছে।

নীলা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হাসতে হাসতে বললেন, “আজকের দিনটা সত্যিই অসাধারণ কাটল কামরুল! টমেটোর ঝোল, বসের বকুনি, কালবৈশাখী ঝড়—কোনো বিবাহবার্ষিকীতে এত রোমাঞ্চ হয়নি!”

কামরুল সাহেব ভিজে সপসপে পাঞ্জাবিটা টেনে খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর ধীরপায়ে হোয়াইটবোর্ডের সামনে গিয়ে একটা শুকনো মার্কার দিয়ে লিখলেন:

“পরবর্তী বিবাহবার্ষিকী (১০ই আগস্ট, আগামী বছর): সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা—সোফায় বসে চুপচাপ মুড়ি খাওয়া এবং নীলার কথা শুনে চলা। কোনো রিভাইজড প্ল্যান গ্রহণযোগ্য নয়!”

নীলা ডাইনিং রুম থেকে এক কাপ গরম চা এনে কামরুল সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন, “এই প্ল্যানটা কিন্তু দারুণ হয়েছে কামরুল! এটাই তোমার জীবনের সেরা পারফেক্ট প্ল্যান!”

গল্প ৪: চালাকের গলায় দড়ি

রফিক আর শফিক—দুই শৈশবের বন্ধু। তবে বন্ধুত্বের চেয়ে তাদের মূল সম্পর্ক হলো প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে বেশি চালাক, কে কাকে বানিয়ে বোকা বানাতে পারে—এই নিয়েই তাদের দিন রাত চলে।

একদিন বিকেলে চায়ের দোকানে বসে রফিক বলল, “শফিক, তোর কি মনে আছে সেইবার তুই আমাকে একশ টাকার জালনোট দিয়ে আম কিনে খাইয়েছিলি? তুই ভাবিস তুই খুব চালাক, তাই না?”

শফিক চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে একটা আত্মতৃপ্তির হাসি দিল। “আরে রফিক, বুদ্ধি যার আছে সে জালনোট দিয়েও আম খেতে পারে। তুই তো সোজা মানুষ, তোকে দিয়ে ওসব হবে না।”

রফিক চোখ সরু করল। “তাই? আচ্ছা চল, আজ একটা বাজি হয়ে যাক। আমরা দুজনে শহরের সবচেয়ে কঠিন কাজটা করব। দেখব কার বুদ্ধি বেশি।”

“কী কাজ?” শফিক ভুরু তুলল।

“আমাদের পাড়ার কাঞ্জুস কিপটে আজহার সাহেবের কাছ থেকে বিনামূল্যে এক কেজি খাঁটি গাওয়া ঘি আদায় করা!” রফিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল।

আজহার সাহেবকে সবাই চেনে। লোকটা এতটাই কিপটে যে, রাতে কুপির তেল বাঁচানোর জন্য অন্ধকারে ভাত খায় আর মাছি চায়ে পড়লে মাছিটাকে চেপে ডানা থেকে চা নিংড়ে নিয়ে তারপর ফেলে দেয়। তার কাছ থেকে এক ফোঁটা পানি পাওয়াও যেখানে অসম্ভব, সেখানে এক কেজি গাওয়া ঘি?

শফিক এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর টেবিল চাপড়ে বলল, “শর্ত মঞ্জুর! যে ঘি আনতে পারবে, অন্যজন তাকে আগামী এক মাস প্রতিদিন চারবেলা বিরিয়ানি খাওয়াবে। কিন্তু সময় আজ রাত আটটা পর্যন্ত!”

রফিক মনে মনে হাসল। তার কাছে ইতোমধ্যে একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি ছিল।

রফিক সোজা আজহার সাহেবের বাড়ির দিকে রওনা হলো। আজহার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে রফিক খুব বিষণ্ণ মুখে বলল, “আজহার চাচা! আপনার জন্য একটা বিশাল সুখবর আছে, আবার একটা দুঃসংবোরও আছে।”

আজহার সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “সুখবর আবার কী? আর খবর যাই হোক, আমার কাছে কিন্তু কোনো সাহায্য পাবি না!”

রফিক ফিসফিস করে বলল, “চাচা, গ্রামের মোড়ল সাহেব আপনার ব্যবহারে এতই মুগ্ধ হয়েছেন যে তিনি তার মেয়েকে আপনার ছোট ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চান! যৌতুক হিসেবে দেবেন পাঁচ বিঘা জমি!”

আজহার সাহেবের চোখ চকচক করে উঠল। “বলিস কী রে রফিক! পাঁচ বিঘা জমি? তবে দুঃসংবাদটা কী?”

রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দুঃসংবাদ হলো, মোড়ল সাহেবের এক অদ্ভুত শর্ত আছে। তিনি বলেছেন, বরপক্ষ যদি আজ সন্ধ্যার মধ্যে তাকে এক কেজি খাঁটি গাওয়া ঘি উপহার পাঠাতে পারে, তবেই এই বিয়ে পাকা। কিন্তু আপনার মতো কৃপণ—মানে মহৎ লোক তো এত দামি ঘি কিনবে না, তাই বিয়েটা বোধহয় ভেঙ্গেই গেল!”

আজহার সাহেব এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। তিনি ভেতর থেকে নিজের স্পেশাল গাওয়া ঘিয়োর বয়াম বের করে রফিকের হাতে তুলে দিলেন। “এই নে রফিক! এখনই দৌড় দে মোড়ল সাহেবের বাড়ি! বলবি আজহার নিজেই গাভীর দুধ দুইয়ে এই ঘি বানিয়েছে!”

রফিক বয়ামটা বগলে চেপে বিজয়ের হাসি হেসে বের হয়ে এলো। মনে মনে বলল, “শফিক ব্যাটা, এবার দেখ রফিকের বুদ্ধি কত দূর চলে!”

এদিকে শফিক কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে ছিল না। সে আগে থেকেই রফিকের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল। সে দূর থেকে রফিককে ঘিয়ের বয়াম হাতে আজহার সাহেবের বাড়ি থেকে বের হতে দেখল।

শফিক মনে মনে বলল, “হুহ! রফিক ভেবেছে সে একাই চালাক? এখন আমি খেলব আসল খেলা।”

শফিক দৌড়ে গিয়ে মোড়ের ছাগল বিক্রেতা রমিজ মিয়ার কাছে গেল। রমিজ মিয়ার কাছে একটা বিশাল আকৃতির, কুৎসিত এবং অতিরিক্ত দুর্গন্ধযুক্ত পাঁঠা ছাগল ছিল। শফিক পাঁচশত টাকা দিয়ে রমিজকে রাজি করাল এবং ছাগলটাকে নিয়ে সোজা রফিকের বাড়ির গলির মুখে গিয়ে দাঁড়াল।

রফিক যখন সিটি বাজাতে বাজাতে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল, শফিক তখন রাস্তার এক কোণে ছাগলটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ার্ত গলায় চেঁচাতে শুরু করল, “ওরে বাবারে! আমাকে বাঁচাও! এই পাগলা ছাগল আমাকে মেরে ফেলল!”

রফিক থমকে দাঁড়াল। “কী হলো রে শফিক? ছাগল তোকে মারবে কেন?”

শফিক জাঁদরেল অভিনয় শুরু করল। “রফিক! তুই চিনিস না এটাকে? এটা তো সেই খ্যাপাটে ছাগল! যে কোনো মানুষকে দেখলে বিশেষ করে যার হাতে কাচের বয়াম থাকে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মাথা গুঁতিয়ে একদম পিষে ফেলে! গত সপ্তাহে তো এক লোককে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে!”

রফিক ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। “বলিস কী! কিন্তু আমার হাতে তো ঘিয়ের বয়াম!”

“ঐ তো! ওই দেখ, ছাগলটা তোর বয়ামের দিকেই তাকাচ্ছে!” শফিক আতঙ্কিত গলায় বলল। “তোর যদি জীবনের মায়া থাকে, তবে বয়ামটা ওই ঝোপের ভেতর লুকিয়ে রেখে দে! তারপর দুজন মিলে পালিয়ে যাই চল!”

রফিক ভয় পেয়ে ঘিয়ের বয়ামটা রাস্তার পাশের এক ঘন ঝোপের মধ্যে সাবধানে লুকিয়ে রেখে দিল। তারপর বলল, “চল, পালাই!”

দুজন মিলে এক দৌড়ে মোড়ের চায়ের দোকানে চলে এলো।

চায়ের দোকানে এসে রফিক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বাপরে! বাঁচা গেল। কিন্তু শফিক, আমি কিন্তু আজহার সাহেবের কাছ থেকে ঘি ঠিকই বের করে এনেছিলাম! শর্ত অনুযায়ী বাজিতে আমিই জিতেছি!”

শফিক একগাল হেসে পকেট থেকে ঘিয়ের বয়ামটা বের করে টেবিলে রাখল। “সত্যি? এই বয়ামটার কথা বলছিস তো?”

রফিক চোখ ছানাবড়া করে বলল, “এটা তোর কাছে কীভাবে এলো? ওটা তো ঝোপের ভেতর ছিল!”

শফিক গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে বলল, “আরে বোকা! ওটা কোনো পাগলা ছাগল ছিল না। ওটা রমিজ মিয়ার পোষা ছাগল! তোকে বোকা বানিয়ে ঘিয়ের বয়ামটা ঝোপে ফেলানোর জন্যই তো আমি ওই ড্রামাটা করলাম! বুদ্ধি কার বেশি বুঝলি তো? এখন আগামী এক মাস বিরিয়ানি খাওয়ানোর জন্য রেডি হ!”

রফিক রাগে কটমট করে তাকাল। তার নিজস্ব বুদ্ধি ভেস্তে গেছে দেখে সে চরম অপমানিত বোধ করল। কিন্তু সে হার মানার পাত্র নয়।

রফিক শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা শফিক, তোর বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। তবে একটা কথা বলি? তুই কি ঘিয়ের বয়ামের তলাটা চেক করেছিস?”

শফিক ভুরু কুঁচকে বলল, “মানে? তলায় আবার কী থাকবে?”

রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুই আজহার সাহেবকে চিনিস না। উনি এত সহজে ঘি দেবেন? উনি আমাকে ঘিয়ের বয়াম দেওয়ার সময় ফিসফিস করে বলেছিলেন, বয়ামের ওপরের এক ইঞ্চি শুধু ঘি, আর ভেতরের পুরোটা আসলে বাসি ডালডা আর চর্বি মেশানো ভেজাল জিনিস! উনি জানতেন আমি কারো কাছে ঘিটা নিয়ে যাব, তাই ঠকানোর জন্য এই কাজ করেছেন।”

শফিক চমকে উঠল। “কী বলিস? বাসি ডালডা?”

“হ্যাঁ রে,” রফিক আফসোসের সুর তুলে বলল, “আমি তো ভাবছিলাম রাস্তায় ফেলে দেব। তুই কষ্ট করে কুড়িয়ে আনলি! নে, এখন এই ডালডার বিরিয়ানি খা!”

শফিক রেগে গিয়ে বলল, “কী বললি? এত কষ্ট করে ডালডা আনলাম? ওই কিপটে বুড়োকে আজ আমি দেখে নেব!”

শফিক রাগে অন্ধ হয়ে ঘিয়ের বয়ামটা নিয়ে সোজা আছাড় দিল রাস্তার ওপর! বয়ামটা ভেঙে চুরমার হয়ে খাঁটি সুবাসিত ঘি চরাচরে ছড়িয়ে পড়ল। খাঁটি ঘিয়ের গন্ধে চায়ের দোকান ম-ম করতে লাগল।

রফিক তখন ঠাণ্ডা মাথায় আঙুল দিয়ে মেঝে থেকে কিছুটা ঘি তুলে মুখে দিয়ে বলল, “আহা! কী চমৎকার খাঁটি গাওয়া ঘি! আজহার সাহেব তো সত্যিই খাঁটি ঘি দিয়েছিল রে শফিক! তুই এত কষ্ট করে আমার ঘিটা চুরি করলি, আর এক নিমেষে রাস্তায় ঢেলে দিলি?”

শফিক বোকার মতো ভাঙা বয়াম আর ছড়িয়ে থাকা ঘিয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখটা এক লহমায় শুকনো তালের মতো হয়ে গেল।

রফিক শফিকের কাঁধে হাত রেখে বলল, “বন্ধু শফিক, তুই আমার কাছ থেকে চালাকি করে ঘিটা চুরি তো করলি, কিন্তু তোর নিজের অতিরিক্ত চালাকির জন্য সেটা খেতে পারলি না! এটাকে বলে—চালাকের গলায় দড়ি!”

শফিক মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। রফিক হেসে উঠে বলল, “নে, ঘি তো নষ্ট করলি। বাজির বিরিয়ানি কবে খাওয়াচ্ছিস বল?”

শফিক একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কাল দুপুর থেকেই শুরু হোক রে রফিক… তবে বিরিয়ানির সাথে যেন অবশ্যই খাঁটি ঘি থাকে, নয়তো তোর এই চালাকি আমি সহ্য করব না!”

গল্প ৫: পানের খিলির মহাভারত

আনোয়ার সাহেব একজন নিতান্তই শান্তশিষ্ট মানুষ। ঝামেলা এড়িয়ে চলাই তার জীবনের মূল নীতি। কিন্তু সমস্যা হলো, ঝামেলার যেন আনোয়ার সাহেবের সঙ্গেই চিরকালের প্রেম!

ঘটনার সূত্রপাত একটা অতি সাধারণ রবিবার সকালে।

আনোয়ার সাহেব বাজার থেকে ফেরার পথে মোড়ের সাত্তার মিয়ার পানের দোকানে দাঁড়ালেন। হঠাৎ তার ইচ্ছা হলো একটা স্পেশাল জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার। সাত্তার মিয়া যত্ন করে পান বানিয়ে আনোয়ার সাহেবের হাতে দিল।

আনোয়ার সাহেব পানটা মুখে পুরতে যাবেন, ঠিক তখনই খেয়াল করলেন—পানের খিলির ভেতর থেকে সরু একটা সুতোর মতো অংশ বের হয়ে আছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তিনি দেখলেন, ওটা সুতো নয়, একটা অতি ক্ষুদ্র লোহার তারের টুকরো! বোধহয় জর্দার কৌটা খোলার সময় ভুলবশত পড়ে গেছে।

আনোয়ার সাহেব সাত্তার মিয়াকে ধমক না দিয়ে শান্তভাবে বললেন, “সাত্তার, এই দেখো পানের ভেতর তারের টুকরো। মানুষ খেলে তো পেটের ভেতর নাইলন আঁশ গজিয়ে যাবে! এগুলো দেখে শুনে পান বানাবে তো।”

সাত্তার মিয়া পানের বাটা গোছাতে গোছাতে অত্যন্ত চড়া গলায় বলল, “কী যে বলেন আনোয়ার ভাই! আমার দোকানে ত্রিশ বছর ধরে মানুষ পান খায়, কারো পেটে কোনোদিন রড-আজার বের হয়নি! আপনার চোখে সমস্যা হয়েছে। ওইটা পান পাতার রগ!”

আনোয়ার সাহেবের আত্মসম্মানে লাগল। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে তিনি পানের ভেজাল সহ্য করবেন না! তিনি বললেন, “পান পাতার রগ? দাঁড়াও, তোমায় প্রমাণ দেখাচ্ছি!”

আনোয়ার সাহেব পকেটের চশমাটা পরে, পানটা হাতের তালুতে নিয়ে পাশের মুদির দোকানে গেলেন। মুদির দোকানি মজিদ মিয়াকে বললেন, “মজিদ, তোমার ম্যাগনিফাইং গ্লাস বা একটা ভালো আলো দাও তো, সাত্তারকে দেখাই এটা লোহা নাকি রগ!”

মজিদ মিয়ার আবার স্বভাব হলো তিলকে তাল করা। সে চেঁচিয়ে উঠে বলল, “বলেন কী আনোয়ার ভাই? সাত্তারের পানে বিষাক্ত লোহার তার পাওয়া গেছে? ওরে বাবা! সাত্তার কি মানুষকে মারার চক্রান্ত করছে নাকি?”

মজিদের চিল্লাচিল্লিতে মুহূর্তের মধ্যে মুদির দোকানে চার-পাঁচজন কৌতূহলী লোক জমা হয়ে গেল।

পথচারী এক যুবক বলল, “বিষাক্ত তার? এ তো ক্যাটারিং সেক্টরে বিরাট নাশকতা! এখনই ভোক্তা অধিকারে ফোন দেওয়া দরকার!”

আনোয়ার সাহেব প্রমাদ গুনলেন। “আরে না না, আপনারা ভুল বুঝছেন! আমি শুধু সাত্তারকে একটু সাবধান করতে…”

কিন্তু ততক্ষণে আর আনোয়ার সাহেবের হাতে কিছু নেই। উত্তেজিত জনতা সাত্তার মিয়ার পানের দোকান ঘেরাও করে ফেলেছে।

সাত্তার মিয়াও কম যায় না। সে পান কাটার জাঁতি উঁচিয়ে হাঁকাল, “কে আমার পানে তার পাইছে? আনোয়ার ভাই মিথ্যা রটাচ্ছে! আমার ব্যবসা ধ্বংস করার জন্য ওনাকে মোড়ের চটপটিওয়ালা টাকা দিয়েছে!”

“কী বললি?” পাশেই চটপটির ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রশিদ মিয়া গামছা সামলে এগিয়ে এলো। “আমি আনোয়ার ভাইকে টাকা দিয়েছি? তোর পান যে পচা, ওটা পুরো পাড়ার লোক জানে!”

পাঁচ মিনিটের মধ্যে পানের দোকানের সামনে বিরাট গ্যাংওয়ার শুরু হয়ে গেল। পানের দোকানদার বনাম চটপটিওয়ালা, আর তাদের নিজ নিজ সমর্থক দল! কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু করে হাতাহাতি, তারপর পানের বাটা ছোঁড়াছুড়ি!

আনোয়ার সাহেব চশমা হাতে নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। “আরে ভাই থামুন! আমি তো শুধু তারের কথা বলেছিলাম… পান তো আমি খাই-ই নি!”

কিন্তু তার কথা শোনে কে? একটা উন্ত পানের বরোজ থেকে উড়ে আসা জর্দার বয়াম সোজা এসে আনোয়ার সাহেবের কপালে লাগল। ‘ঠাস’!

কপালে লাল জর্দার দাগ আর একটা বড় ফোলা নিয়ে আনোয়ার সাহেব ভয়ে ওখান থেকে দৌড় দিলেন। তিনি ভাবলেন, দ্রুত থানায় গিয়ে একটা জিডি করে আসা দরকার, নয়তো মারামারির দায় তার ওপর চাপবে!

তিনি ধাতে ধাতে থানায় গিয়ে পৌঁছালেন। ডিউটি অফিসার রফিক সাহেব চা খাচ্ছিলেন। আনোয়ার সাহেবের কপালে লাল জর্দার দাগ আর ফোলা দেখে অফিসার চমকে উঠলেন।

“কী ব্যাপার আনোয়ার সাহেব? কপালে রক্ত? কে আপনাকে এমন রক্তাত্ত করল?” অফিসার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

আনোয়ার সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “না অফিসার, এটা রক্ত নয়, এটা খাসিয়া জর্দা! আসলে মোড়ের মাথায় একটা ছোট ঘটনা ঘটেছে…”

“কী? দিনদুপুরে রাস্তায় মানুষ খুন করার চেষ্টা? আর আপনি বলছেন ছোট ঘটনা?” অফিসার টেবিল চাপড়ে উঠলেন। “জলিল! ফোর্স রেডি করো! মোড়ের মাথায় শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে। আসামিদের এখনই গ্রেফতার করতে হবে!”

আনোয়ার সাহেব আঁতকে উঠলেন। “আরে ভাই, শুনুন তো! ঘটনা হলো একটা পানের খিলি…”

কিন্তু অফিসার রফিক ততক্ষণে হুইসেল বাজিয়ে চারজন কনস্টেবল নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়েছেন। আনোয়ার সাহেবকেও তারা টেনে তুলে নিল—ঘটনাস্থল চিহ্নিত করার জন্য!

পুলিশের সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি যখন পানের দোকানে এসে পৌঁছাল, তখন সেখানকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মোড়ের ওপর প্রায় শ পাঁচেক লোক জমে গেছে। দুই পক্ষে ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি চলছে।

পুলিশের গাড়ি দেখে সবাই শান্ত হলো। অফিসার রফিক গাড়ি থেকে নেমে গর্জে উঠলেন, “এখানে কী হচ্ছে? কে এই দাঙ্গার মূল উসকানিদাতা?”

মুদির দোকানি মজিদ মিয়া সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে আনোয়ার সাহেবকে দেখিয়ে দিল! “স্যার! ওই যে আনোয়ার ভাই! উনিই এসে প্রথমে রটালেন যে সাত্তারের পানে বিষাক্ত বিস্ফোরক তার আছে! তারপরই এই যুদ্ধ শুরু হলো!”

আনোয়ার সাহেবের চোখ ছানাবড়া! “আমি বিস্ফোরক বলেছি? মজিদ, তুমি না বললে…”

সাত্তার মিয়াও কেঁদে ফেলে বলল, “হ্যাঁ স্যার! এই আনোয়ার সাহেব আমার দোকানে এসে খামখা রটালো! আমি গরিব মানুষ, আমার দোকান ভেঙে শেষ করে দিল!”

অফিসার রফিক চরম বিরক্ত হয়ে আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকালেন। “আনোয়ার সাহেব! আপনি একজন গণ্যমান্য লোক হয়ে পুরো এলাকায় গুজব ছড়িয়ে এত বড় দাঙ্গা বাধালেন? আপনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় শান্তি ভঙ্গের অভিযোগে মামলা হবে!”

আনোয়ার সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি পকেট থেকে সেই অভিশপ্ত পানটি বের করলেন—যা এতক্ষণ ধরে তিনি নিজের পকেটে পরম যত্নে রুমালে পেঁচিয়ে রেখেছিলেন!

তিনি চিৎকার করে বললেন, “অফিসার! আপনি দয়া করে এই পানটা দেখুন! আমি কোনো গুজব ছড়াইনি! এই পানের ভেতর তারের টুকরো ছিল, আমি শুধু সেটা সাত্তারকে দেখাতে চেয়েছিলাম!”

অফিসার রফিক সন্দেহভাজন চোখে আনোয়ার সাহেবের হাত থেকে পানটি নিলেন। চারপাশের উন্মাদ জনতা একদম শান্ত হয়ে গেল। সবাই পানের দিকে তাকিয়ে রইল।

অফিসার রফিক সাবধানে পানের খিলিটা খুললেন। কনস্টেবল জলিল একটা টর্চ জ্বালিয়ে পানের ওপর আলো ফেলল।

অফিসার রফিক চশমাটা নাকের কাছে এনে, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পানের ভেতরের বস্তুটা পরীক্ষা করলেন। তারপর একটা ছোট চিমটা দিয়ে সেই ‘সোনার হরিণ’ অর্থাৎ ‘লোহার তার’ টা বাইরে টেনে আনলেন।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সত্য প্রকাশ পেতে যাচ্ছে!

অফিসার রফিক তারের টুকরোটা হাতের তালুতে নিয়ে ভালো করে দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকালেন।

“আনোয়ার সাহেব,” অফিসার শান্ত গলায় বললেন।

“হ্যাঁ স্যার?” আনোয়ার সাহেবের বুকে আশার আলো।

“আপনি কি আজ সকালে আপনার এই চশমাটা কোথাও মেরামত করিয়েছেন?”

আনোয়ার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ! আজ সকালে চশমার ফ্রেমের একটা ছোট স্ক্রু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল, তাই দর্জিদের দোকান থেকে একটা সরু সুতো আর তার দিয়ে সাময়িকভাবে আটকে নিয়েছিলাম…”

অফিসার রফিক চিমটা দিয়ে ধরে থাকা তারটি আনোয়ার সাহেবের চশমার ফ্রেমের পাশে ধরলেন। দেখা গেল, আনোয়ার সাহেবের চশমার ডাঁট থেকে চার মিলিমিটারের একটা ঝুলন্ত তারের টুকরো খসে গিয়ে পানের ওপর পড়েছিল! পানওয়ালা সাত্তার মিয়া তারের কিছুই দেয়নি; ওটা ছিল আনোয়ার সাহেবের নিজের চশমার ফ্রেমেরই অংশ!

পুরো মোড়ের বাজারে পাঁচ সেকেন্ডের জন্য এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন সবাই চাঁদে অবতরন করেছে।

সাত্তার মিয়া হা করে আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল।

মজিদ মিয়া মাথা চুলকাতে লাগল।

অফিসার রফিক চশমার ডাঁটের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক গভীর নিঃশ্বাস নিলেন।

আনোয়ার সাহেব নিজের চশমাটার দিকে তাকালেন, তারপর হাত থেকে পানটার দিকে তাকালেন। পরম মুহূর্তে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তার মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে শুরু করল।

আনোয়ার সাহেব অত্যন্ত নম্রভাবে চশমাটা পকেটে রাখলেন। তারপর চারপাশের উত্তপ্ত জনতার দিকে তাকিয়ে একটা নিরীহ হাসি দিয়ে বললেন, “আসলে… আমাদের দেশের অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তি যে কত দ্রুত এগোচ্ছে, সেটাই আমি আপনাদের পরীক্ষা করে দেখাচ্ছিলাম! হা হা… সাত্তার, তোমার জর্দা কিন্তু সত্যিই চমৎকার!”

কিন্তু জনতা আর তার রসিকতা শোনার মেজাজে ছিল না।

অফিসার রফিক হ্যান্ডকাফ বের করতে করতে বললেন, “আনোয়ার সাহেব, চশমার তারের রহস্য তো মিটল। এবার থানায় চলুন, গুজব ছড়ানো আর পুলিশের সময় নষ্ট করার অপরাধে আপনাকে একটা ‘স্পেশাল পান’ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছি!”

সেই ঘটনার পর থেকে হরিপুর ও তার আশেপাশের তিন পাড়ায় এক নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। কেউ যদি পান কিনতে যায়, তবে সে চশমা খুলে পকেটে রেখে, চোখ বন্ধ করে পানের দোকানে অর্ডার দেয়। কারণ সবাই জানে—আনোয়ার সাহেবের মতো অতি-সচেতন হতে গেলে, নিজের চশমার একটা ভাঙা তার দিয়েও পুরো শহরে কুরুক্ষেত্র বেধে যেতে পারে!

মন্তব্য

1
অতিথি
মন্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে আপনি কমিউনিটি নীতিমালায় সম্মতি দিচ্ছেন।
sajedul islam প্রশাসক

কি দারুণ লিখনী, সত্যিই মনটা ছুঁয়ে গেলো