নোটিশ
ছোটগল্প

পোস্ট মাস্টার – আবেগঘন বাংলা ছোট গল্প | Post Master Bangla Golpo

একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ভাঙা ডাকঘর, কিছু পুরোনো চিঠি আর পনেরো বছর পর আসা একটি নীল খাম। জেনেনিন পোস্ট মাস্টারের জীবন বদলে দেওয়া সেই রহস্যময় চিঠির গল্প। একটি হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া…

m.lekhokbd.meলেখক 1 মিনিটে পড়া যাবে 9 বার পঠিত 0 মন্তব্য
অক্ষরের মাপ
পোস্ট মাস্টার - আবেগঘন বাংলা ছোট গল্প
0

পলিপড়া পুরোনো শালকাঠের ডেস্কটার এক কোণে কালিছাপ পড়া রাবারের স্ট্যাম্পটা কয়েকবার ঠুকে নিলেন রতনবাবু। ঝুপ ঝুপ করে একটা ভারী, ছন্দময় শব্দ হলো। বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ডাকঘরের টিনের চালের ফাঁক গলে, ঘরের মধ্যে উবু হয়ে থাকা ধূলিকণাদের সেই আলোয় ভাসতে দেখা যাচ্ছে। নদীপারের গ্রাম ‘সুতিপুর’। আষাঢ়ের মাঝামাঝি এসে গাঙের পানি বেশ ফুলেফেলে উঠেছে। ডাকঘরের ঠিক পেছনের বাঁশঝাড়টায় বাতাসে পাতা খসখসের একটা মেদুর শব্দ।

রতনবাবুর বয়স বছর পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। মাথার দুধারের চুলগুলোয় হালকা পাক ধরেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির এক গভীর প্রচ্ছায়া, যা কেবল বয়সের নয়, বহু বছর ধরে জমতে থাকা নিঃসঙ্গতার। পকেটের পিতলের ঘড়িটা বের করে দেখলেন—পাঁচটা বাজতে দশ। পেছনের বারান্দায় বুট জুতোর শব্দ করতেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন।

বিপিন ঢুকেছে। সুতিপুর ডাকঘরের একমাত্র ডাকপিয়ন। পরনের খাকি পোশাকটা হাঁটু পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি। কাঁধের চট দিয়ে তৈরি থলেটা টেবিলে রেখেই সে এক গ্লাস পানি টেনে নিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেলল।

“আজকে নদী পার হইতে বেশ বেগ পাইতে হইছে, পোস্টমাস্টার বাবু। কলার ভেলাটাও গাঙের টানে ভাইসা গেছিল প্রায়,” কপাল থেকে ঘাম মুছে বলল বিপিন।

রতনবাবু চশমার কাচটা ধুতি দিয়ে মুছতে মুছতে হাসলেন। এক চিলতে শুকনো হাসি। “খবরের ভার তো কম না বিপিন। নদীও বোধহয় বোঝে, মানুষের সুখ-দুঃখের বোঝা টানা সহজ কথা না।”

থলে থেকে চিঠির তোড়াটা উপুড় করে দেওয়া হলো কাঠের ওপর। নীল, হলুদ আর সাদা রঙের কতগুলো খাম। কোনটা কাঁচা হাতে লেখা, কোনটা আবার শহরের ছাপ মারা অফসেট কাগজের রেজিস্ট্রি ডাক। সুতিপুরের মতো ছোট গ্রামে ডাকঘর কেবল একটা সরকারি কার্যালয় নয়, গ্রামের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিনের বিকেলেই এই ভাঙা কুঠুরিতে মানুষের অপেক্ষা জমা হয়।

“রশিদ মিঞার বড় ছেলের মানি অর্ডার আইছে বাবুমশাই?” বারান্দার কাঠের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল জহুরা বেওয়া। ষাটোর্ধ্ব এই মহিলার ছেলেটা থাকে চট্টগ্রামে, জাহাজ ভিড়ানোর কাজ করে। প্রতি মাসের এই সময়টায় বুড়ি এসে দাঁড়ায় ডাকঘরের থকে চুয়ে পড়া আলোর বৃত্তে।

রতনবাবু চিঠির গা থেকে সিল মারার কাজ থামিয়ে চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। তারপর ডেস্কের ড্রয়ার থেকে তিনটে একশ টাকার নোট বের করে একটা রসিদ এগিয়ে দিলেন। “এই তো, লালু পাঠাইছে। আঙুলের ছাপটা দাও জহুরা খালা।”

জহুরা বেওয়া বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল টিপে সই দিল। টাকার নোট কটা আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে মৃদু হেসে বলল, “পোস্টমাস্টার বাবু, পোলাডা চিঠি লেখে না রে। খালি টাকা পাঠায়। তারে একটু বলে দিও তো, পোলার হাতের একটা দাগ দেখার লাইগা মাডা আজও বাঁচি আছে।”

রতনবাবু নীরব রইলেন। জহুরার এই অনুযোগ নতুন নয়। তিনি কেবল ঘাড় নাড়লেন। জহুরা চলে যাওয়ার পর বিপিন একে একে চিঠিগুলো ছাঁটাই করতে লাগল। জগা শেখের মেজ পোলার চিঠি—কুয়েত থেকে এসেছে; পঞ্চানন হালদারের আদালতের সমন; আর নিভার চিঠি।

নিভা। সুতিপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। প্রতি মঙ্গলবার বিকেল নামলেই সে ডাকঘরের সামনের আমগাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে আলগা করে খোঁপা বাঁধা। রতনবাবু জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন, নিভা এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখ দুটোতে এক ব্যাকুল নীরবতা।

“আজকেও কোনো চিঠি নাই, নিভা দিদি,” বিপিন নিজ থেকেই হেঁকে বলল।

নিভার মুখের ওপর ম্লান আলোর একটা ছায়া এসে পড়ে মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কিছু না বলেই ধীর পায়ে মাটির পথ ধরে হেঁটে চলে গেল। নিভার এই নীরব আসা আর যাওয়া রতনবাবু গত তিন বছর ধরে দেখছেন। ও কার জন্য অপেক্ষা করে, গ্রামের কেউ তা ঠিক জানে না। কেউ বলে, শহরের কোন কলেজের মাস্টার নাকি ওকে কথা দিয়েছিল ফিরে আসার; আবার কেউ বলে, নিভার অতীত অন্য কোনো গাঁয়ে আটকা পড়ে আছে। রতনবাবু কখনো জানতে চাননি। গ্রামের মানুষের হাজারো গোপন কষ্ট এই ডাকঘরের চার দেয়ালের মাঝখানে এসে জমা হয়, পোস্টমাস্টার হিসেবে সেসব জেনেও অজানা রাখার একটা অলিখিত কৌশল তিনি শিখে নিয়েছেন।

সন্ধ্যা নেমে এল সুতিপুরে। বাঁশঝাড়ে জোনাকি জ্বলতে শুরু করেছে। বিপিন থলে গুটিয়ে বাড়ি চলে গেল। ডাকঘরের কাঠের দরজা দুটো বন্ধ করার আগে রতনবাবু হেরিকেনটা জ্বালিয়ে নিলেন।

হলদেটে আলোর শিখাটা সামান্য কেঁপে উঠল বাতাসের ঝাপটায়। কেরোসিনের এক ধরণের পরিচিত গন্ধ বাতাসে ভাসছে। রতনবাবু ডেস্কের ওপর ছড়ানো বাকি কাজ গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎই চিঠির বান্ডিলটার একদম তলায় জমে থাকা একটা ছোট, হালকা নীল রঙের খামের দিকে তার নজর গেল।

অন্যান্য চিঠির ভিড়ে খামটা ঢাকা পড়েছিল। রতনবাবু হাত বাড়িয়ে খামটা তুলে নিলেন। পোস্টমার্কের ছাপটা আবছা—কলকাতার কোন এক প্রধান ডাকঘরের। কিন্তু খামের ওপর প্রাপকের জায়গায় লেখা নামটা দেখে রতনবাবুর হাতটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চশমার কাচটা ঝাপসা হয়ে এল কি?

নাম লেখা— ‘রতননাথ সেন, পোস্টমাস্টার, সুতিপুর পোস্ট অফিস’।

আর প্রেরকের কোণায় লেখা শুধু একটি নাম— ‘অনুরাধা’।

কত বছর? পনেরো? না কি ষোল বছর?

রতনবাবু মোমের আলোয় নিস্পন্দ হয়ে বসে রইলেন। চেনা নামটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল। বাইরের বৃষ্টিহীন আষাঢ়ের হাওয়াটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। হাতের নীল খামটা যেন কোনো কাগজের টুকরো নয়, অতীতের একখণ্ড জলজ্যান্ত দীর্ঘশ্বাস।

পুরোনো স্মৃতিগুলো কোনোদিন পুরোপুরি মুছে যায় না। তারা ধুলো জমে থাকা বইয়ের মতো বুকের কোন এক অন্ধকার আলমারিতে পড়ে থাকে। হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় পাতা উল্টে গেলে সব চেনা ছবি এক নিমেষে সামনে চলে আসে।

রতনবাবুর অতীতেও একটা নদী ছিল। সে নদী সুতিপুরের মতো এত শান্ত বা আলসে ছিল না; সে নদী ছিল ময়মনসিংহের এক ছোট শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দুরন্ত ব্রহ্মপুত্র। রতনবাবু তখন চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক টগবগে যুবক। চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন, আর বুকে ছিল লেখালেখির তীব্র ভীতি আর ভালোবাসা। অনুরাধা ছিল তার বন্ধু, সহপাঠী, এবং আরও একটু বেশি কিছু—যা মুখে কোনোদিন স্পষ্ট করে বলা হয়ে ওঠেনি।

অনুরাধার বাবা ছিলেন শহরের নামজাদা উকিল। রাশভারী, আভিজাত্যে কঠোর এক মানুষ। অন্যদিকে রতন ছিলেন এক একান্নবর্তী পরিবারের বড় ছেলে, যার ওপর ছিল সংসারের ভারী দায়িত্ব। ভালোবাসার কথা উচ্চারিত হওয়ার আগেই বাঁধ সেধেছিল জীবনের বাস্তবতা।

“তুমি কি সত্যিই এই ছোট শহরে আটকে থাকবে রতন?” নদীর পাড়ে বসে একদিন প্রশ্ন করেছিল অনুরাধা। বাতাস তার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

রতন দূর দিগন্তে ভেসে যাওয়া পালের নৌকার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “সবাইকে তো ছুটতে হয় না অনু। কেউ কেউ থেকে যায়, কেবল অন্যদের ফেরার পথটা দেখে রাখার জন্য।”

“যে ফিরে আসবে না, তার জন্য পথ দেখে লাভ কী?” অনুরাধার গলায় ছিল এক অদ্ভুত অভিমান।

তার কিছুদিন পরেই শহরের চাকরি ছেড়ে রতন ডাকঘরের চাকরিতে যোগ দেন। পিতা মারা যাওয়ার পর ছোট তিনটে ভাই-বোনের পড়াশোনা আর সংসার চালানোর জন্য একটা নির্দিষ্ট মাইনের চাকরি খুব দরকার ছিল। শহর ছেড়ে তিনি চলে আসেন এক দুর্গম গাঁয়ে। আর অনুরাধা? অনুরাধার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় কলকাতার এক বিত্তশালী পরিবারের চিকিৎসকের সাথে।

যেদিন অনুরাধা শহর ছেড়ে চলে যায়, সেদিন শেষবারের মতো একটা চিঠি লিখেছিল রতনকে। তাতে লেখা ছিল— ‘তোমার জীবনের কাছে হেরে যাওয়াটা হয়তো স্বাভাবিক ছিল রতন, কিন্তু আমার ভাবনার কাছে তোমার হার যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারছি না। তুমি কেন লড়াই করলে না? তুমি কি আমাকে একটা চিঠিতেও বলতে পারতে না—থেকে যাও?’

রতন উত্তর দেননি। উত্তর দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি তার কাছে ছিল না। সংসারে অভাব ছিল, বোনদের বিয়ের দায় ছিল। নিজের ভালোবাসার কথা ভেবে পুরো পরিবারকে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো সাহস বা স্বার্থপরতা—কোনোটাই তার ছিল না। তিনি নীরবতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তারপর বছরের পর বছর পার হয়েছে। বোনেরা পাত্রস্থ হয়েছে, ভাইয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু রতন আর কোনোদিন ময়মনসিংহে ফেরেননি। নিজেকে নির্বাসনে দিয়েছেন সুতিপুরের মতো এক নিঃসঙ্গ গ্রামে। মানুষের চিঠি পে পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে, অথচ নিজের ভেতরের সব খবর গুমরে মরেছে চার দেয়ালের মাঝে।

হেরিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিলেন রতনবাবু। হাত দুটো সামান্য কাঁপছে।

পনেরো বছর পর অনুরাধার চিঠি। কেন এত বছর পর? কী লিখতে পারে সে? সে কি এখনও অভিমান ধরে রেখেছে? নাকি এত বছর পর ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য এই চিঠি?

রতনবাবু খামটা খুলতে গিয়েও থেমে গেলেন। কাঠের ডেস্কে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। আঁধার ঘনিয়ে এসেছে পুরো গ্রামে। সুতিপুরের ঘরবাড়িতে মিটমিট করে প্রদীপ জ্বলছে। কত দূর থেকে এসেছে এই চিঠি, কত হাত ঘুরে! মানুষের জীবনের গল্পগুলো কেমন অদ্ভূত। আমরা যাদের ছেড়ে আসি, তারা কি সত্যিই অতীত হয়ে যায়? নাকি তারা আমাদের অগোচরে আমাদেরই কোনো সমান্তরাল জীবনে বেঁচে থাকে?

তিনি খামের মুখটা সাবধানে কাটলেন। ভেতরের চিঠিটা চার ভাঁজ করা। নীল রঙেরই কাগজ। পুরোনো দিনের সুবাস আজও যেন হালকা করে লেগে আছে তাতে।

চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন রতনবাবু।

‘রতন, জানি এই চিঠিটা যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, তখন তোমার চারপাশের পৃথিবীটা অনেক বদলে গেছে। হয়তো আমার নামটাও তোমার স্মৃতিতে ধুলো পড়া কোনো পুরোনো ফাইলের মতো আটকে আছে। তাও লিখছি। কারণ আমার হাতে সময় আর একদম নেই।

তুমি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ এত বছর পর আমার খবর পেয়ে? ভাবছ, যে মানুষটা একদিন তোমার জীবন থেকে নিরুদ্দেশে হারিয়ে গিয়েছিল, সে আবার কেন ফিরে এল?

আমি ভালো নেই রতন। শরীরের ভেতরে যে মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, ডাক্তাররা তাকে কয়েক মাসের বেশি সময় দেয়নি। কিন্তু আমি কোনো আফসোস নিয়ে যেতে চাই না। কলকাতার এই বিশাল বাড়িতে, সব ঐশ্বর্যের মাঝে বসেও আমি প্রতিদিন সুতিপুরের ওই ছোট ডাকঘরটার কথা ভাবতাম। জানতাম তুমি ওখানেই আছ। বিপিন নামের লোকটার হাত দিয়ে গ্রামের মানুষের চিঠি পাঠাও, আবার পে পৌঁছে দাও।

তোমার ওপর আমার খুব অভিমান ছিল রতন। মনে হতো তুমি কাপুরুষ, তুমি পালিয়ে গেছ। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝি—পলায়ন আর আত্মত্যাগ এক জিনিস নয়। তুমি সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নিজের আনন্দকে বলি দিয়েছিলে। আমি সেদিন তা বুঝিনি।

আমার একটা বড় মিনতি আছে রতন। আমার মেয়ে—অনন্যা। ও কলকাতায় চিত্রকলার ওপর পড়াশোনা করছে। কিন্তু ওর চোখ দুটো ঠিক তোমার মতো—একটু বিষণ্ণ, একটু অনুসন্ধানী। ও খুব একা হয়ে পড়েছে রতন। ওর বাবা গত বছর মারা গেছেন। আর আমার পর এই পৃথিবীতে ওর আঁকড়ে ধরার মতো আর কেউ থাকবে না। আমি ওকে তোমার কথা বলেছি। বলেছি, সুতিপুরে এমন একজন মানুষ আছে, যার কাছে গেলে ও জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাবে।

অনন্যা তোমার কাছে যাচ্ছে রতন। হয়তো এই চিঠিটা পাওয়ার দু-একদিনের মধ্যেই ও পৌঁছাবে। ওকে ফিরিয়ে দিও না। ওকে কোনো সম্পদ দিতে হবে না, কেবল তোমার ওই নদীর পারের পোস্ট অফিসের বারান্দায় একটু বসে থাকার জায়গা দিও। তুমি যেভাবে গ্রামের মানুষকে তাদের সুখ-দুঃখ সয়ে নেওয়ার শক্তি দাও, আমার মেয়েটাকেও একটু বাঁচতে শেখাও।

ইতি, অনুরাধা।’

চিঠিটা শেষ করে রতনবাবু কাঠের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। হেরিকেনের আলোটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। তার চোখের কোণ ঘেঁষে একবিন্দু পানি গড়িয়ে পড়ল পনেরো বছর ধরে শুকনো থাকা গালের চামড়ায়।

চিঠিটা টেবিলের ওপর রেখে তিনি দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। ঘরের বাইরে আষাঢ়ের বাতাস আরও জোরালো হয়েছে। চালের ওপর টিনের খটখট শব্দ।

অনুরাধা আর নেই? না কি এখনও বাঁচি আছে? চিঠিখানা কতদিন আগের?

পোস্টমার্কের তারিখটার দিকে আবার তাকালেন রতনবাবু। এক সপ্তাহ আগের তারিখ। তার মানে…

পরদিন সকাল থেকেই সুতিপুরে বৃষ্টি নামল মুষলধারে। নদীপাড়ের কাঁচা রাস্তাটা কাদায় থকথক করছে। সকাল নটায় রতনবাবু ছাতা মাথায় দিয়ে ডাকঘরে এসে পৌঁছালেন। ঘরের চাল দিয়ে দু-এক জায়গায় পানি পড়ছে। তিনি বালতি বসিয়ে দিলেন নিচে।

বিপিন এল সাড়ে দশটা নাগাদ। ভিজতে ভিজতে।

“আজকে তো নদী পার হওয়া অসম্ভব ছিল বাবু। ঘাটে এক অচেনা কন্যে বসে আছে। শহর থাইকা আইছে। সুতিপুর ডাকঘর খোঁজে।”

রতনবাবুর বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। তিনি হাতের কলমটা রেখে বিপিনের দিকে তাকালেন। “মেয়ে? ঘাটে বসে আছে?”

“হ বাবুমশাই। হাতে একটা বড় ব্যাগ, আর আঁকার খাতা। নাম জিগাইলাম, বলল অনন্যা।”

রতনবাবু কোনো কথা না বলে ছাতাটা হাতে তুলে নিলেন। বিপিনের অবাক দৃষ্টি পেছনে ফেলে তিনি দ্রুত পায়ে হেঁটে চললেন সুতিপুরের খেয়াঘাটের দিকে।

বৃষ্টির ছাঁটে চারপাশ আবছা। কাদা পেরিয়ে, পিছল পথ সামলে তিনি যখন ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছালেন, দেখতে পেলেন খেয়াঘাটের যাত্রীছাউনিটার নিচে একটি তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ জিন্স আর হালকা নীল রঙের কুর্তি। তার কাঁধে একটা ভারী ক্যানভাস ব্যাগ। মেয়েটি নদীর ঘোলা পানির দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পন্দ হয়ে।

রতনবাবু কাছে গিয়ে থামলেন। তার শ্বাসের গতি দ্রুত।

মেয়েটি ঘুরে তাকাল। চশমার ওপর দিয়ে রতনবাবু তার চোখের দিকে তাকালেন। একদম সত্যি—অনুরাধার চোখ দুটো এমন ছিল না, এই চোখ দুটো গভীর, শান্ত, কিন্তু এক অপার্থিব বেদনায় ভরা।

“আপনি… আপনি কি রতনবাবু?” মেয়েটির গলা কাঁপল সামান্য।

রতনবাবু ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়লেন। “হ্যাঁ। তুমি অনন্যা?”

অনন্যা কিছুক্ষণ রতনবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার হাত থেকে ক্যানভাসের ব্যাগটা খসে পড়ল ভিজে যাওয়া কাঠের পাটাতনে। দু হাতে মুখ ঢেকে সে কেঁদে উঠল। শব্দহীন, গভীর এক কান্না।

রতনবাবু কোনো সান্ত্বনার বাক্য খুঁজে পেলেন না। তিনি কেবল অনন্যার মাথার ওপর ছাতাটা বাড়িয়ে ধরলেন, যাতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মেয়েটিকে স্পর্শ করতে না পারে। নিজে অর্ধেক ভিজে যেতে লাগলেন আষাঢ়ের ধারাপাতে।

বিকেলে বৃষ্টি কমলে রতনবাবু অনন্যাকে নিয়ে ডাকঘরে এলেন। ডাকঘরের পেছনের ছোট কামরাটায়, যেখানে তিনি এতদিন একা থাকতেন, সেখানে অনন্যার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

অনন্যা জানাল, চিঠিটা পোস্ট করার তিনদিন পরেই অনুরাধা মারা গেছেন। শেষ মুহূর্তে অনুরাধার একটাই কথা ছিল— অনন্যা যেন সুতিপুরে যায়।

“মা আমাকে বলত, জীবনের সবচেয়ে বড় ডাকঘর নাকি মানুষের মন,” চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মৃদু স্বরে বলল অনন্যা। সে ঘরের চারপাশের পুরোনো কাঠের আসবাব, ধুলোপড়া ফাইল আর ঝুলন্ত হ্যারিকেনটার দিকে তাকাচ্ছিল। “যেখানে সব হারানো চিঠি জমা হয়ে থাকে। মা বলত, তুমি নাকি সেই চিঠির হিসাব রাখো।”

রতনবাবু জানালাই গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে। বিকেলের ম্লান রোদ ভেসে উঠছে মেঘের ফাঁক দিয়ে।

“তোর মা ভুল বলত না অনন্যা,” রতনবাবু বললেন, তার গলায় গভীর এক প্রশান্তি। “আমরা সারা জীবন চিঠি পৌঁছে দিই এক হাত থেকে অন্য হাতে। মনে করি, কাগজের টুকরোই বুঝি সংবাদ পাঠায়। কিন্তু আসল চিঠি তো রয়ে যায় চোখের ভাষায়, না বলা শব্দে। তোর মায়ের সেই না বলা চিঠিটা পৌঁছাতে পনেরো বছর সময় লাগল।”

দিন যেতে লাগল সুতিপুরে। অনন্যা ধীরে ধীরে মিশে যেতে লাগল গ্রামের সঙ্গে। সে তার ক্যানভাস আর রঙ নিয়ে বসে থাকে নদীর পাড়ে, কখনো বা ডাকঘরের পেছনের বাঁশঝাড়ের ধারে। গ্রামের মানুষগুলো প্রথমে একটু অবাক হয়ে দেখত শহরের এই মেয়েটিকে, কিন্তু কিছুদিন পরেই অনন্যা হয়ে উঠল তাদের প্রিয়।

জহুরা বেওয়া যখন আসে, অনন্যা তার ছবি আঁকে। পঞ্চানন হালদার এলে তাকে গল্প শোনায়। আর নিভা? নিভা যখন মঙ্গলবার বিকেলে এসে দাঁড়ায় আমগাছটার নিচে, অনন্যা তার কাছে গিয়ে বসে। দুটো আলাদা জীবনের গল্প যেন এসে মিলে যায় সুতিপুরের এই ছোট উঠোনটায়।

রতনবাবু দেখতেন, অনন্যার আসার পর থেকে ডাকঘরের নিস্তব্ধতা যেন এক নতুন সুর পেয়েছে। তিনি আগের মতোই রাবারের স্ট্যাম্প ঠুকতেন চিঠির গায়ে, কিন্তু এখন আর সেই শব্দটাকে একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর মনে হতো না। মনে হতো, প্রতিটি সিলের ছাপ আসলে মানুষের বেঁচে থাকার এক একটি প্রমাণ।

একদিন সন্ধ্যায়, কাজ শেষ করে রতনবাবু বসে আছেন তার ডেস্কে। অনন্যা বাইরে নদীর ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। বিপিন চিঠি গুটিয়ে চলে যাওয়ার আগে বলল, “পোস্টমাস্টার বাবু, একটা কথা বলি?”

রতনবাবু তাকালেন। “বলো বিপিন।”

“আপনারে না আজ কয়দিন ধরে খুব হালকা দেখায়। যেমন গাঙের পানি নাইমা গেলে চড়টা জাগি ওঠে, তেমন।”

রতনবাবু একটু হাসলেন। কিছু বললেন না।

বিপিন চলে যাওয়ার পর তিনি অনুরাধার সেই নীল খামটা বের করলেন। পকেটের চশমাটা চোখে দিয়ে চিঠিটা আবার পড়লেন। কিন্তু এবার আর তার চোখে পানি এল না। জীবনের সব অপূর্ণতা, সব না-পাওয়ার হিসাব যেন এই এক নীল খামে এসে পূর্ণতা পেয়েছে।

ভালোবাসা মানে সবসময় একসাথে থাকা নয়। কখনো কখনো কাউকে দূরে রেখেও তার স্মৃতিকে শ্রদ্ধায়, দায়িত্বে আর ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রাখা যায়। রতনবাবু তা পেরেছেন। তিনি অনুরাধাকে পাননি, কিন্তু অনুরাধার বিশ্বাসকে তিনি রক্ষা করতে পেরেছেন।

বাইরে তখন আঁধার গাঢ় হয়েছে। অনন্যা ফিরে এসেছে ঘরে। সে এক কাপ গরম চা রতনবাবুর টেবিলে রেখে পাশে এসে দাঁড়াল।

“কী ভাবছ কাকু?” অনন্যা এখন তাকে কাকু বলে ডাকে।

রতনবাবু চিঠির খামটা ড্রয়ারে রেখে ড্রয়ারটা বন্ধ করলেন। একটা হালকা খট করে শব্দ হলো। যেন জীবনের একটা বড় অধ্যায় সযতনে তুলে রাখা হলো ইতিহাসের সিন্দুকে।

“ভাবছি অনন্যা, কাল সকালে তো পঞ্চানন হালদারের সমনটা পৌঁছাতে হবে। আর জহুরা খালার ছেলের রসিদটা আবার চেক করতে হবে,” রতনবাবু মৃদু হেসে বললেন। “ডাকঘরের কাজ কখনো শেষ হয় না রে। একটার পর একটা অপেক্ষা আসতেই থাকে।”

অনন্যা রতনবাবুর মুখের দিকে তাকাল। সেই মুখে এখন আর কোনো বিষাদের ছায়া নেই। আছে এক গভীর, নিরাসক্ত আলো।

অনন্যা ডাকঘরের জানালার পাল্লা দুটো পুরোপুরি খুলে দিল। দূরের নদী থেকে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে এল। রাতের সুতিপুর গ্রামে এখন কোলাহল নেই, কেবল নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

রতনবাবু টেবিলের হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিলেন। এখন আর কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নেই। বাইরে জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে সুতিপুরের পথ, ঘাট, নদী আর এই শতবর্ষী ছোট ডাকঘর।

মানুষ চলে যায়, সম্পর্ক রূপ বদলায়, কিন্তু জীবনের প্রতিটা অপেক্ষার শেষেই লুকিয়ে থাকে নতুন কোনো বেঁচে থাকার অর্থ। সুতিপুরের পোস্টমাস্টার আজ তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন। নীল খামের চিঠিটা হয়তো আর কোনোদিন খোলা হবে না, কিন্তু তার বার্তা সারাজীবনের জন্য খোদাই হয়ে রইল এই নীরব ডাকঘরের প্রতিটি কোণায়।

সব চিঠির গন্তব্য থাকে না, কিছু চিঠি কেবল পথ দেখানোর জন্যই আসে।

মন্তব্য

0
অতিথি
মন্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে আপনি কমিউনিটি নীতিমালায় সম্মতি দিচ্ছেন।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!